ইউরোপের চলমান অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির প্রভাবে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে গ্রিসের রাজপথ। জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী ব্যয়, মজুরি স্থবিরতা, শিক্ষাব্যবস্থার বেসরকারীকরণ এবং সরকারের বিতর্কিত ন্যাটো তোষণ নীতির বিরুদ্ধে একযোগে আন্দোলন শুরু করেছে দেশটির ছাত্র, শিক্ষক ও শ্রমিকরা। রাজধানী এথেন্সের পাশাপাশি দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর থেসালোনিকিতেও ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র জনরোষ।
বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১১টা থেকেই থেসালোনিকির ঐতিহাসিক 'ভেনিজেলোস ভাস্কর্য' চত্বরে সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা সমবেত হতে থাকেন। সেখান থেকে এক বিশাল গণমিছিল শহরের কেন্দ্রস্থলে 'আজিওস দিমিত্রিওস স্ট্রিটে' অবস্থিত মেসিডোনিয়া এবং থ্রেস বিষয়ক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিমুখে রওনা হয়। নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই মন্ত্রণালয় ভবনের সামনে অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা।
বিক্ষোভের কারণে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে শহরজুড়ে তৈরি করা হয় কঠোর পুলিশি বলয়। এছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সকাল ৯টা থেকে ডিমোক্রাতিয়াস, ভেনিজেলোু, আগিয়াস সোফিয়াস, সিনত্রিভানি এবং পানেপিস্থিম্রিও—এই পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রো স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিদাওয়া
ছাত্র-শিক্ষক-জনতা এ সময় সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে চারটি দাবি পেম করা হয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও মজুরি বৃদ্ধি: ২০০৯ সালের অর্থনৈতিক সংকটের আমলের মজুরি কাঠামো বদলে বর্তমান মূল্যস্ফীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে অবিলম্বে নতুন চুক্তি ও ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানানো হয়েছে। একইসাথে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ওপর থেকে বিশেষ কর এবং ভ্যাট প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়।
শিক্ষা ও আবাসন সংকট: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিতকরণ, শিক্ষাখাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং পাবলিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের দাবি তোলেন শিক্ষার্থীরা।
যুদ্ধনীতি ও ন্যাটো বিরোধিতা: সামরিক বাজেট বৃদ্ধি এবং থেসালোনিকি বন্দরকে ইউক্রেন বা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ট্রানজিট হাব হিসেবে ব্যবহারের তীব্র বিরোধিতা করে আন্দোলনকারীরা। তাদের স্পষ্ট দাবি—শহরের ন্যাটো কেন্দ্র বন্ধ করতে হবে এবং যুদ্ধের পেছনে অর্থ না ঢেলে তা জনকল্যাণে ব্যয় করতে হবে।
স্বাস্থ্য অবকাঠামো: জরাজীর্ণ স্কুল ভবন মেরামত এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সামরিক ব্যয় কমিয়ে জনকল্যাণমূলক খাতে অর্থ বরাদ্দের জোর দাবি উঠেছে।
আন্দোলনে অংশ নিয়ে থেসালোনিকি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী মারিয়া পাপাদোপোলৌ বলেছেন, "বাড়িভাড়া দিতেই বেতনের সিংহভাগ চলে যায়। সরকার সাধারণ মানুষের ভবিষ্যতের কথা না ভেবে যুদ্ধাঞ্চলে অস্ত্র পাঠাতে ব্যস্ত। আমরা কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চাই, যুদ্ধের দামামা নয়।"
একই ক্ষোভ প্রকাশ করে শিক্ষক প্রতিনিধি নিকোস থিওডোরো জানিয়েছেন, দ্রব্যমূল্য বাড়লেও বছরের পর বছর শিক্ষকদের বেতন একই জায়গায় আটকে আছে। জরাজীর্ণ স্কুল ভবনের ছাদ খসে পড়ার উপক্রম হলেও সরকার সামরিক খাতেই বিলিয়ন ইউরো ঢালছে।
এদিন যৌথভাবে দেশব্যাপি ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দেন দেশটির শীর্ষস্থানীয় ফেডারেশন ও ট্রেড ইউনিয়ন।
মধ্য ম্যাসেডোনিয়ার মেটাল অ্যান্ড শিপ রিপেয়ার ইউনিয়ন, প্রাইভেট এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন এবং মেট্রো ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের পূর্ণ সমর্থনে এই ধর্মঘট রাজপথে নতুন গতি পেয়েছে। থেসালোনিকি ট্রাফিক পুলিশ সাধারণ মানুষকে বিকল্প রাস্তা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের এই আন্দোলন খুব সহজে থামছে না এবং তা গ্রিক সরকারের ওপর প্রবল রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে।