পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, ব্যাপক লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কটাক্ষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘প্রিয়তমা, প্রেসিডেন্ট আমাদের পাঁচ হাজার ডলার পাঠিয়েছেন। চলো, ফ্রান্সে যাই। জায়গাটা চমৎকার। সেখানে কোনো দাঙ্গা নেই, কোনো বিপ্লব নেই। জানেন তো, বিপ্লবের জন্য ফ্রান্স অবিশ্বাস্য রকম উপযুক্ত জায়গা। চলুন, ফ্রান্সে গিয়ে বিপ্লবে যোগ দিই।’
গত ১৬ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার ডালটনে এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প তার প্রস্তাবিত পাঁচ হাজার ডলারের ‘ট্রাম্প ডিভিডেন্ড’ নিয়ে কথা বলছিলেন। কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পারলে মার্কিন নাগরিকদের এই অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তবে সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই খরচ করতে হবে। জনগণকে সেটি মনে করিয়ে দিতেই তিনি ব্যঙ্গ করে পাঁচ হাজার ডলার নিয়ে ফ্রান্সের যাওয়ার উদাহরণ টেনেছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়, স্থানীয় সময় শনিবার ফ্রান্সজুড়ে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় বিক্ষোভে নামে। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। পরে তা ব্যাপক সহিংসতা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে রূপ নেয়। রোববার সকালেও ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরের রাস্তাঘাটে ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র দেখা যায়। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক ও শিক্ষা সরঞ্জাম সংকটের প্রতিবাদে অক্টোবরের শুরুতে দেশটিতে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়। ধীরে ধীরে তা গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোর উত্তরসূরি নির্বাচনের আর মাত্র ছয় মাস বাকি। তার আগে দেশটিতে এমন সহিংস পরিস্থিতি আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়েও শঙ্কা তৈরি করেছে।
এদিকে ফ্রান্সের চলমান সহিংসতা নিয়ে মন্তব্য করেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও। তিনি এ পরিস্থিতির জন্য ইউরোপের অভিবাসনকে দায়ী করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ভ্যান্স বলেন, ‘পশ্চিমা উদারপন্থীরা বৈচিত্র্য ও সহানুভূতির নামে তৃতীয় বিশ্বের মানুষদের ফ্রান্সসহ অন্য দেশগুলোতে নিয়ে এসেছে। তারা সমাজে একীভূত হওয়া এবং সামঞ্জস্যের মৌলিক প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করেছে।’
‘তাদের সতর্ক করা হয়েছিল, এর পরিণতি এমনই হবে। কিন্তু তারা শোনেনি। আমি প্রার্থনা করি, অসাধারণ মানুষের সুন্দর দেশ ফ্রান্স যেন আরও ঐতিহাসিক স্থাপনা আগুনে পুড়ে যাওয়ার আগেই এই উন্মত্ততা বন্ধ করতে পারে। আমি আশা করি, আমেরিকানরাও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটরা আপনাদের দেশের জন্য এমন ভবিষ্যৎই চান’, যোগ করেন ভ্যান্স।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, শনিবারের বিক্ষোভে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শ্রমিক সংগঠন সিজিটির দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় আট লাখ।
বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে ইটপাটকেলসহ নানা ভারী বস্তু ছুড়ে মারেন এবং আতশবাজি নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
প্যারিসের মেয়র ইম্যানুয়েল গ্রেগোয়ার বলেছেন, রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। মুখোশ পরা একদল তরুণ রাস্তায় রাখা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন এবং বিভিন্ন দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট চালান।
সহিংসতা শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফ্রান্সের লিমোজ শহরে ১৪০ বছরের বেশি পুরোনো একটি নগরভবন অগ্নিসংযোগে প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। অঞ্চলটির শীর্ষ প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা ভবনটিতে ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেন।
এ ছাড়া মার্সেই ও লিল শহরে আরও দুটি নগরভবনে ঢুকে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। বোর্দো শহরে পুলিশের একটি স্থাপনায় ভাঙচুর করা হয়। অন্যদিকে লিওঁ শহরে বিক্ষোভকারীরা একটি পর্যটন তথ্যকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেন।
দেশজুড়ে সহিংসতা, সরকারি স্থাপনায় হামলা এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রো।
তিনি বলেন, ‘যারা ভাঙচুর চালিয়েছে, প্রশাসনিক কার্যালয় বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করেছে কিংবা লুটপাটে অংশ নিয়েছে, এমনকি আমাদের নগরভবনগুলোতেও যারা এসব অপরাধ করেছে, তাদের বিচারের আওতায় আনা হবে এবং শাস্তি দেওয়া হবে।’