ভোরের আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে বিশাল এক জেলিফিশ! মাথার মতো উজ্জ্বল অংশ, সেখান থেকে নেমে আসছে আলোর সরু রেখা। প্রথম দেখায় মনে হয় কোনো অজানা মহাজাগতিক বস্তু। কিন্তু বাস্তবে এটি কোনো প্রাণী বা নতুন আবিষ্কৃত গ্যাসীয় বস্তু নয়। স্পেসএক্সের রকেট উৎক্ষেপণের পর আকাশে তৈরি হওয়া এই অদ্ভুত দৃশ্যের পেছনে রয়েছে পদার্থবিজ্ঞানের পরিচিত কিছু নিয়ম।
১৩ অক্টোবর ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেপ ক্যানাভেরাল থেকে ফ্যালকন ৯ রকেট উৎক্ষেপণ করে স্পেসএক্স। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার এই মিশনের নাম সিআরএস-৩৫। উৎক্ষেপণের পর রকেটের পেছনে তৈরি হওয়া উজ্জ্বল, ছড়িয়ে পড়া গ্যাসের মেঘ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের আকাশে দৃশ্যমান হয়। এর আকৃতি অনেকটা জেলিফিশের মতো হওয়ায় ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কেন এমন আকৃতি
রকেট যখন ভূপৃষ্ট থেকে আকাশের দিকে উঠতে থাকে, তখন তার ইঞ্জিন থেকে প্রচণ্ড গতিতে গরম গ্যাস বেরিয়ে আসে। উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের বায়ুচাপ কমে যায়। ফলে নির্গত গ্যাস দ্রুত প্রসারিত হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রসারিত গ্যাসের মেঘই কখনো কখনো জেলিফিশের মাথা ও শুঁড়ের মতো আকৃতি তৈরি করে।
তবে শুধু গ্যাস ছড়িয়ে পড়লেই এমন উজ্জ্বল দৃশ্য দেখা যায় না। এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সূর্যের আলো।
১৩ অক্টোবরের উৎক্ষেপণটি হয়েছিল স্থানীয় সময় ভোর ৬টা ৩৩ মিনিটে, সূর্য ওঠার ঠিক আগে। তখন পৃথিবীর মাটিতে আলো পুরোপুরি না পৌঁছালেও বায়ুমণ্ডলের অনেক উঁচুতে থাকা রকেটের গ্যাসের মেঘে সূর্যের আলো পড়তে পারে। আশপাশের আকাশ অন্ধকার থাকায় সেই আলোকিত মেঘ আরও উজ্জ্বল ও স্পষ্ট দেখায়।
এ কারণেই একে অনেক সময় ‘স্পেস জেলিফিশ’ বলা হয়। এটি মূলত রকেটের নির্গত গ্যাসের বিস্তার ও সূর্যালোকের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া দৃশ্য, জেলিফিশের মতো কোনো বস্তু মহাকাশে ভেসে থাকার ঘটনা নয়।
প্রতিটি রকেট উৎক্ষেপণে এমন দৃশ্য দেখা যায় না কেন
রকেট উৎক্ষেপণ নিয়মিত ঘটনা হলেও এমন দৃশ্য প্রতিবার তৈরি হয় না। এর জন্য কয়েকটি বিষয় একসঙ্গে অনুকূলে থাকতে হয়—উৎক্ষেপণের সময়, সূর্যের অবস্থান, রকেটের উচ্চতা এবং বায়ুমণ্ডলের পরিস্থিতি।
দিনের বেলায় সূর্যের আলো চারপাশে ছড়িয়ে থাকায় গ্যাসের মেঘের উজ্জ্বলতা আলাদা করে চোখে নাও পড়তে পারে। আবার রাতে রকেট উৎক্ষেপণ হলেও মেঘটি যদি সূর্যের আলো না পায়, তাহলে একই ধরনের দৃশ্য তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়।
অন্যদিকে, ভোর বা সন্ধ্যায় পৃথিবীর নিচের অংশ অন্ধকার থাকলেও ওপরের বায়ুমণ্ডলে সূর্যের আলো পৌঁছাতে পারে। এই বৈপরীত্যই দৃশ্যটিকে এত নাটকীয় করে তোলে।
আলোচিত দৃশ্যের পেছনে মিশন
সিআরএস-৩৫ ছিল নাসার জন্য স্পেসএক্সের ৩৫তম বাণিজ্যিক মিশন। ফ্যালকন ৯ রকেটের মাধ্যমে কার্গো ড্রাগন মহাকাশযানে করে ৬ হাজার ৩০০ পাউন্ডের বেশি, অর্থাৎ প্রায় ২ হাজার ৮৬০ কেজি সরঞ্জাম ও বৈজ্ঞানিক উপকরণ আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পাঠানো হয়।
এসব উপকরণের মধ্যে ছিল কৃত্রিম রেটিনা তৈরির প্রযুক্তি পরীক্ষা, ত্রিমাত্রিক হৃদযন্ত্রের টিস্যু নিয়ে গবেষণা এবং মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে নতুন ধরনের কাচ তৈরির প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের সরঞ্জাম। মহাকাশে এসব পরীক্ষা থেকে পাওয়া ফলাফল ভবিষ্যতে চিকিৎসা ও উপকরণবিজ্ঞানের গবেষণায় কাজে লাগতে পারে। নাসার সূচি অনুযায়ী, কার্গো ড্রাগনটির ১৫ অক্টোবর মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছানোর কথা।