Image description

রিয়াদে বিমানবন্দরে হামলার জেরে সৌদি আরবগামী ফ্লাইট একের পর এক বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি কর্মীরা। ছুটিতে দেশে আসা কর্মীরা কাজে ফিরতে পারছেন না। যাত্রা পিছিয়ে যাওয়ায় তাঁদের ভিসার মেয়াদ ও চাকরি নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থান মূলত মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সবচেয়ে বড় গন্তব্য সৌদি আরব। অন্য কয়েকটি বড় শ্রমবাজার বন্ধ বা সংকুচিত হওয়ায় দেশটির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। যদিও এ বছরের শুরু থেকে সৌদিতে কর্মী যাওয়ার সংখ্যা কমছে। এখন সৌদিতে হামলা ও বিমান চলাচল বিঘ্নের ঘটনায় বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের ওপর নতুন ধাক্কা এল। এই পরিস্থিতিতে সরকারি সংস্থা, রিক্রুটিং এজেন্সি ও অভিবাসন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন।

গতকাল সোমবার বেলা একটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ১৫ জনের বেশি যাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। সৌদি আরবগামী যাত্রীদের অধিকাংশই বিমানবন্দরে এসেছেন তাঁদের ফ্লাইট বাতিলের তথ্য জানতে। আবার কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন বিকল্প কোনো ফ্লাইটে গন্তব্যে যেতে।

বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) হিসাবে, গত বছরের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৬৬ জন। এ বছরের একই সময়ে সংখ্যাটি কমে হয়েছে ৫ লাখ ৮০ হাজার ৬৩২ জন, অর্থাৎ প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে। শুধু সৌদি আরবে যাওয়ার ছাড়পত্র নেওয়া কর্মীর সংখ্যা ৫ লাখ ৭২ হাজার ৫৪ থেকে কমে হয়েছে ৩ লাখ ১১ হাজার ৫৬৭ জন। এই কমার হার প্রায় ৪৬ শতাংশ।

গতকাল সোমবার বেলা একটা থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ১৫ জনের বেশি যাত্রীর সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। সৌদি আরবগামী যাত্রীদের অধিকাংশই বিমানবন্দরে এসেছেন তাঁদের ফ্লাইট বাতিলের তথ্য জানতে। আবার কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন বিকল্প কোনো ফ্লাইটে গন্তব্যে যেতে।

 
সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হুতিদের একের পর এক হামলার কারণে দেশটিতে বাংলাদেশি যাত্রীদের যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন সৌদিপ্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীরা।  সোমবার দুপুরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তোলা
সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হুতিদের একের পর এক হামলার কারণে দেশটিতে বাংলাদেশি যাত্রীদের যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন সৌদিপ্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীরা। সোমবার দুপুরে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তোলাছবি: প্রথম আলো

বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মোসলেম তালুকদার নামের এক কর্মী প্রথম আলোকে বলেন, রিয়াদের একটি দোকানের কাজে যোগ দিতে প্রথমবার সৌদি যাওয়ার কথা তাঁর। গতকাল দুপুর ১২টায় ফ্লাইট ছিল, সকালেই আসেন বিমানবন্দরে। তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। অন্য কোনো ফ্লাইটে যাওয়ার উপায় খুঁজছেন। কোনো উপায় না পেলে বাড়ি ফিরে যেতে হবে।

গতকাল গভীর রাতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দরের কার্যক্রমে বিধিনিষেধ চলছে। এতে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী বিভিন্ন এয়ারলাইনসের ৬১টি ফ্লাইটে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। এর মধ্যে কিছু ফ্লাইট বাতিল ও কিছু স্থগিত হয়েছে। এসব ফ্লাইটের ৮ হাজার ৩৮১ জন যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, যাঁরা ঢাকা থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার কথা ছিল।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে পাঁচ দিনে গত রোববার চতুর্থবারের মতো হামলা হয় সৌদি আরবের রিয়াদের কিং খালেদ বিমানবন্দরে। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে গত শনিবার। এতে দুই বাংলাদেশিসহ ১৩ জন নিহত হন। আহত এক বাংলাদেশির অবস্থা আশঙ্কাজনক। এরপর ঢাকা থেকে রিয়াদগামী ফ্লাইট বাতিল হতে থাকে।

রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের সংগঠন বায়রার সদস্যরা ও বিএমইটি সূত্র বলছে, এ বছর দিনে গড়ে ১ হাজার ২০০ জন করে নতুন কর্মী সৌদি আরবে গেছেন। এর পাশাপাশি ছুটিতে আসা কর্মীদের ৬০০ থেকে ৭০০ জন করে দিনে ফিরে গেছেন। এ হিসাবে গত তিন দিনে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কর্মী ফ্লাইট জটিলতায় আটকা পড়ার কথা। ফ্লাইট বন্ধ থাকলে এটি আরও বাড়তে থাকবে।

রিয়াদের একটি দোকানের কাজে যোগ দিতে প্রথমবার সৌদি যাওয়ার কথা তাঁর। গতকাল দুপুর ১২টায় ফ্লাইট ছিল, সকালেই আসেন বিমানবন্দরে। তাঁর ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। অন্য কোনো ফ্লাইটে যাওয়ার উপায় খুঁজছেন। কোনো উপায় না পেলে বাড়ি ফিরে যেতে হবে।
মোসলেম তালুকদার
সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রবাসী কর্মীরা এসেছেন ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় যেতে পারছেন না তাঁরা
সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রবাসী কর্মীরা এসেছেন ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল ও স্থগিত হওয়ায় যেতে পারছেন না তাঁরাছবি: প্রথম আলো

হুমকিতে বিদেশে কর্মসংস্থান

বাংলাদেশ থেকে ১৯৭৬ সালে বিদেশে কর্মী পাঠানো শুরু হয়। মূলত এটি বাড়তে শুরু করে নব্বইয়ের দশকে। অন্যদিকে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সময়ে বছরে কর্মী পাঠানোর গড় সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর মধ্যে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি কর্মী গেছেন ২০২৩ সালে—ওই বছর বিদেশে যান ১৩ লাখের বেশি কর্মী। সংখ্যাটি যত বড়ই হোক না কেন, বিদেশ যেতে আগ্রহী তরুণের তালিকা কখনোই ছোট হয়নি।

সমস্যা হলো, শ্রমবাজারটি গুটিকয় দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৫ বছরে মোট ২০৩টি দেশে কর্মী পাঠানো হয়েছে। এ সময় মোট কর্মী গেছেন ১ কোটি ১০ লাখের বেশি। এর প্রায় ৭৯ শতাংশ কর্মী গেছেন মাত্র পাঁচটি দেশে। সব মিলিয়ে ৯৪ শতাংশ কর্মী গেছেন ১০টি দেশে।

বিদেশে কর্মসংস্থানের তালিকার শীর্ষে থাকা দেশের মধ্যে আছে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইন ও মালদ্বীপ। সবই এশিয়ার দেশ, যার মধ্যে সাতটি মধ্যপ্রাচ্যের। ৯৮টি দেশে দেড় দশকে ১০০ জন করেও কর্মী পাঠানো যায়নি। নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশকেন্দ্রিক বাজারনির্ভরতা এখন জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, একটিমাত্র শ্রমবাজারের ওপর চলছে বিদেশে কর্মসংস্থান, সেটিও এখন স্থবির হয়ে গেছে। বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি করতে না পারায় এ পরিণতি। ফ্লাইট বাতিলের কারণে নতুনদের পাশাপাশি পুরোনো কর্মীরাও ফিরতে পারছেন না। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হতে পারে। কুয়েত যুদ্ধ ও করোনা মহামারির সময় আটকে পড়া ব্যক্তিদের ভিসা নবায়ন করা হয়েছিল। এবারও দেশটির সঙ্গে আলোচনা করতে পারে সরকার।

বিদেশে কর্মসংস্থানের তালিকার শীর্ষে থাকা দেশের মধ্যে আছে সৌদি আরব, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, কুয়েত, জর্ডান, বাহরাইন ও মালদ্বীপ। সবই এশিয়ার দেশ, যার মধ্যে সাতটি মধ্যপ্রাচ্যের। ৯৮টি দেশে দেড় দশকে ১০০ জন করেও কর্মী পাঠানো যায়নি।
ফ্লাইট বাতিল। বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষায় এক যাত্রী। ১১ অক্টোবর
ফ্লাইট বাতিল। বিমানবন্দরের বাইরে অপেক্ষায় এক যাত্রী। ১১ অক্টোবরছবি: প্রথম আলো

কয়েক বছর ধরে কর্মসংস্থান বাড়ছে শুধু সৌদি আরবে। দেশটিতে ২০২৪ সালে সোয়া ছয় লাখ বাংলাদেশি কাজের জন্য গিয়েছিলেন। গত বছর তা বেড়ে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ছাড়ায়। তবে এ বছরের প্রথম ৯ মাসে গেছেন ৩ লাখ ৯ হাজারের মতো কর্মী। অর্থাৎ কমছে।

বিএমইটির তথ্য বলছে, গত বছর সব মিলিয়ে বিদেশে গেছেন ১১ লাখ ৩২ হাজারের বেশি কর্মী। এবার যুদ্ধের পর থেকে সৌদিতে কর্মসংস্থান কমছে। গত বছর অক্টোবরের প্রথম ১২ দিনে বিভিন্ন দেশে যেতে বিএমইটি থেকে ছাড়পত্র নিয়েছেন ১৪ হাজার ১৭৪ জন। এবার একই সময়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন ১১ হাজার ১২২ জন। এর মধ্যে সৌদি আরবে যেতে গত বছর ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ৯৭১ জন, আর এবার নিয়েছেন ১ হাজার ৮৫০ জন।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক প্রথম আলোকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিদেশে কর্মসংস্থান কিছুটা ধাক্কা খায়। অল্প পরিসরে হলেও নতুন গন্তব্যে কর্মী পাঠানো হয়েছে। এখন সৌদি নতুনভাবে শঙ্কা তৈরি করেছে। এতে প্রথম বছরে ১৫ লাখ কর্মী পাঠানোর লক্ষ্য হয়তো পূরণ হবে না। তবে সরকার বিকল্প শ্রমবাজার তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। যাঁরা আটকা পড়েছেন, তাঁদের বিদেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা করা হবে। এর আগে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর দিকেও স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছিল।

বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি ও ট্রানজিট রুটে চলাচলকারী ৬১টি ফ্লাইটে সরাসরি প্রভাব পড়েছে। কিছু ফ্লাইট বাতিল ও কিছু স্থগিত। সোমবার রাত তিনটা পর্যন্ত রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধের ঘোষণা আছে। এরপর আবার নতুন করে সিদ্ধান্ত জানাবে দেশটি।
ফ্লাইটের  খবরের অপেক্ষায় এক পরিবার । ১১ অক্টোবর
ফ্লাইটের খবরের অপেক্ষায় এক পরিবার । ১১ অক্টোবরছবি: প্রথম আলো

আগাম বাতিল হচ্ছে ফ্লাইট

বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, ৬১টি ফ্লাইটের মধ্যে সৌদি আরবের সঙ্গে সরাসরি চলাচলকারী ফ্লাইট ১২টি। বাকি ৩৯টি ট্রানজিট ফ্লাইট। সরাসরি ফ্লাইটের মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ৯টি, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ২টি, সৌদিয়া এয়ারলাইনসের ৪টি এবং রিয়াদ এয়ারওয়েজের ৭টি ফ্লাইট চলাচলে প্রভাব পড়েছে।

রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিস্ফোরণের পর সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে বিধিনিষেধ তৈরি হয়। গতকাল রাত তিনটা পর্যন্ত বিমানবন্দর বন্ধের ঘোষণা আছে। এরপর আবার নতুন করে সিদ্ধান্ত জানাবে দেশটি।

বাংলাদেশ বিমান ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস আলাদা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রিয়াদ বিমানবন্দর বন্ধ থাকায় ২১ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা পথে ইউএস–বাংলার সব ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা থেকে রিয়াদগামী সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে বিমান। ফ্লাইটের নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হলে সংশ্লিষ্ট যাত্রীদের জানিয়ে দেবে তারা।

অন্য উড়োজাহাজ সংস্থা এখন পর্যন্ত ফ্লাইট বাতিলের আগাম ঘোষণা দেয়নি। তবে তারা পরিস্থিতি বুঝে প্রতিদিন ফ্লাইটের অবস্থান জানাচ্ছে।

গতকাল বেলা দুইটায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সৌদি আরবের দাম্মাম যাওয়ার কথা ছিল আবুল হোসেনের। নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে সেই ফ্লাইট ধরতে গতকাল সকাল ১০টার দিকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসেছেন তিনি। আবুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ছয় বছর আগে সৌদি আরবে গিয়েছেন, দেশটিতে টাইলসের মিস্ত্রি হিসেবে কাজ করেন। ছুটি শেষে ফেরার জন্য তিন মাস আগেই টিকিট করেছেন। ফ্লাইট বাতিল করায় ছুটি শেষে কাজে ফিরতে পারছেন না। যেতে না পারলে চাকরি বাঁচানো কঠিন হয়ে যাবে। সংসার অনিশ্চয়তায় পড়ে যাবে।

রিয়াদগামী ঢাকার ফ্লাইট বাতিলের পাশাপাশি গতকাল থেকে দেশটির জেদ্দাগামী কিছু ফ্লাইটও বাতিল হয়েছে বলে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। বিমানবন্দরের ফ্লাইট–সংক্রান্ত তথ্যে জেদ্দাগামী বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটের ফ্লাইনাস এয়ারলাইনসের ফ্লাইটটি বাতিলের তথ্য প্রদর্শন করা হয়।

সৌদি আরবের বাংলাদেশ দূতাবাস সূত্র বলছে, হামলার পর ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি যাত্রী আটকে পড়েন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে যাওয়া যাত্রী, ওমরাহ পালন করতে যাওয়া ব্যক্তি এবং সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা যাত্রীরা ছিলেন।

রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ সৌদি ইমিগ্রেশন ও সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থাগুলোর সহায়তায় আটকে পড়া যাত্রীদের আবাসন, খাবার ও বিকল্প যাত্রার ব্যবস্থা করেছে। প্রায় ৪০০ বাংলাদেশি যাত্রীকে দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে রিয়াদ থেকে বাহরাইনগামী সৌদিয়া এয়ারলাইনসের দুই বাংলাদেশি কর্মীকে আল খোবারের স্থলসীমান্ত দিয়ে বাহরাইন যেতে সহায়তা করা হয়েছে।

যুদ্ধে হতাহত হচ্ছেন প্রবাসী কর্মীরা

ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে ৩ হাজার ৬৫১ প্রবাসীর মরদেহ আসে দেশে। ২০২০ সালে এটি কমে হয় ৩ হাজার ১৪০ জন। এ বছর জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (মোট ২৭৩ দিন) ৯ মাসে দেশে এসেছে ৪ হাজার ৬৪টি মরদেহ। এ হিসাবে দিনে মরদেহ এসেছে গড়ে ১৪টির বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কর্মী মারা যান সৌদি আরবে।বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান

বহু বছর ধরে কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্য এবং মূলত সৌদিনির্ভর। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কর্মী পাঠানো কমছে। কর্মীরা যেমন যেতে পারছেন না, যাঁরা দেশটিতে আছেন, তাঁরাও হতাহত হচ্ছেন। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের একটা নিরাপদ জায়গা ছিল মধ্যপ্রাচ্য। এখন সেটিও হুমকির মধ্যে পড়েছে। এ কারণে কর্মীর চাহিদা কমে যাবে। বড় রকমের বিপদের মধ্যে পড়তে পারে বাংলাদেশ।
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান

প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নানা দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পাশাপাশি এবার যুদ্ধে মারা যাচ্ছেন কর্মীরা। এ বছর মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর গতকাল পর্যন্ত হামলার শিকার হয়ে মারা গেছেন ১৪ জন বাংলাদেশি। এর মধ্যে ৮ জন বাংলাদেশি কর্মী হিসেবে নিবন্ধিত। সর্বশেষ গত শনিবারের হামলায় দুজন বাংলাদেশি মারা গেছেন, যার মধ্যে একজন প্রবাসী কর্মী। একই হামলায় আহত হয়েছেন ২৭ বাংলাদেশি।

রিয়াদের বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইং থেকে গতকাল পাঠানো সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়, হামলায় আহত ব্যক্তিদের মধ্যে নওগাঁর বাসিন্দা সাফফাত রহমানের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি ওমরাহ ভিসায় সৌদি আরব গিয়েছিলেন। সাফফাতসহ আহত ১৫ জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্য ১২ জনকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আহত ২৭ বাংলাদেশির মধ্যে ১১ জন সৌদি আরবে কর্মরত এবং ১৬ জন ওমরাহ ভিসায় দেশটিতে গেছেন।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, বহু বছর ধরে কর্মসংস্থান মধ্যপ্রাচ্য এবং মূলত সৌদিনির্ভর। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কর্মী পাঠানো কমছে। কর্মীরা যেমন যেতে পারছেন না, যাঁরা দেশটিতে আছেন, তাঁরাও হতাহত হচ্ছেন। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগের একটা নিরাপদ জায়গা ছিল মধ্যপ্রাচ্য। এখন সেটিও হুমকির মধ্যে পড়েছে। এ কারণে কর্মীর চাহিদা কমে যাবে। বড় রকমের বিপদের মধ্যে পড়তে পারে বাংলাদেশ। বেকারদের কর্মসংস্থান কমবে এবং প্রবাসী আয় কমতে থাকবে। তাই সরকারের উচিত, দেশের অর্থনীতির অন্যতম নির্ভরতার দেশ সৌদির সঙ্গে দ্রুত আলোচনা করা। ঝুঁকি কমাতে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা জরুরি।