হুতিদের সঙ্গে চলমান সংঘাতে সৌদি আরবকে সহায়তা করতে সেনা পাঠাচ্ছে পাকিস্তান। তবে এত বড় সিদ্ধান্ত দেশটির পার্লামেন্টে নেওয়া হয়নি, হয়েছে সামরিক বাহিনী থেকে। পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে দেশকে দূরে রাখার পক্ষে ছিল। সেই সিদ্ধান্তের ১১ বছর পর কোনো ধরনের সংসদীয় ভোট ছাড়াই সৌদি আরবে দ্রুত অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করতে সম্মত হয়েছে ইসলামাবাদ।
এখন প্রশ্ন উঠছে- পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি কার? দেশটির সংসদের নাকি সেনাবাহিনীর?
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের ভাষ্য, সংসদকে পাশ কাটিয়ে সৌদিতে সেনা মোতায়েন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের অধীনে দেশটির পররাষ্ট্রনীতির ওপর সামরিক বাহিনীর মজবুত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকেই স্পষ্ট করে তোলে।
গত বছরের সাংবিধানিক পরিবর্তনের মাধ্যমে ২০৩০ সাল পর্যন্ত আসিম মুনিরকে সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং আজীবন ফিল্ড মার্শাল হিসেবে পদমর্যাদা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁকে যেকোনো ফৌজদারি বিচারিক প্রক্রিয়া থেকেও দায়মুক্তি দেওয়া হয়।
আটলান্টিক কাউন্সিলের সাউথ এশিয়া বিষয়ক সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘অতীতে এমন সময় ছিল যখন পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সেনা না পাঠানোর পক্ষে ভোট দিত এবং সামরিক বাহিনী সেই সিদ্ধান্ত মেনে চলত। কিন্তু এখন আর সেই যুগ নেই, এটি একদমই একটি ভিন্ন যুগ।’
যদিও পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সমস্ত প্রয়োজনীয় সরকারি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে এত বড় সিদ্ধান্তে মন্ত্রিসভা নাকি পার্লামেন্ট জড়িত ছিল, তা খোলাসা করেনি। উল্টো সেনা মোতায়েনের বিস্তারিত বিষয়কে ‘অপারেশনাল গোপনীয়তার বিষয়’ (সামরিক গোপনীয়তা) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
রিয়াদে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং মক্কা চুক্তির বাকী দুই দেশ সৌদি আরব ও তুরস্কের সেনাপ্রধানের একটি জরুরি বৈঠকের পর দ্রুত সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তের ঘোষণা আসে।
পাকিস্তান কত সেনা পাঠাবে,তাদের মিশন কী হবে, কত খরচ হবে এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশিত হয়নি। ইরান সমর্থিত হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযানে পাকিস্তানি সেনারা সরাসরি অংশ নেবে কি না, তা-ও স্পষ্ট নয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মক্কা চুক্তির আগে ২০২৫ সালের সৌদি-পাকিস্তান নিরাপত্তা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান আগেই প্রায় ৮ হাজার সেনা পাঠিয়েছিল।
এদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান বর্তমানে তেহরানের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। তবে ইসলামাবাদ যদি হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে, তবে তা ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটাতে পারে।
রয়টার্সের ভাষ্যে, ২০১৫ সালের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মূল পার্থক্যটি রাজনৈতিক, আইনি নয়। দেশের সংবিধান তখন যেভাবে কেন্দ্রীয় সরকারকে সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দিয়েছিল, এখনো ঠিক একইভাবে দিচ্ছে। এতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
এর আগেও পাকিস্তানে যখন গণতান্ত্রিক সরকারগুলো ক্ষমতায় ছিল, তখনও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র সম্পর্কের মতো ক্ষেত্রগুলো সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই ছিল। এখন এটা সবাই জানে, বর্তমানে আসিম মুনির তার পূর্বসূরি যেকোনো সেনাপ্রধানের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।
কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক অ্যান্ড্রিয়াস ক্রিগ বলেন, বৈদেশিক অংশীদারেরা পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীকে অপরিহার্য বলে মনে করছে, যা দেশের অভ্যন্তরে তাদের ক্ষমতার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করছে।
রয়টার্স এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএলএন) এবং তার মিত্র দল পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে (পিপিপি) মন্তব্যের জন্য অনুরোধ করেও কোনো সাড়া পায়নি।