Image description

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এখন শুধু শিক্ষা খাতের সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এই আন্দোলন দেশটির বড় একটি আর্থিক সমস্যাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। সেটি হলো বাড়তে থাকা সরকারি ঋণ এবং বাজেট ঘাটতি।

ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ফ্রান্সের সরকারি ঋণ জুনে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। অর্থনীতির মোট আকারের চেয়েও এখন এই ঋণের পরিমাণ বেশি। ঋণের সুদ পরিশোধের খরচও বাড়ছে। একই সময়ে সরকারি ব্যয়ের চাপ বাড়ছে। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ায় পেনশনের খরচ বাড়ছে। আবার প্রতিরক্ষা খাতেও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা বলছেন, স্কুলগুলোতে শিক্ষক কম। শ্রেণিকক্ষগুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। অনেক স্কুলের ভবনও জরাজীর্ণ। এসব সমস্যা সমাধানে আরও অর্থ চান তারা।

এখানেই সরকারের বড় সংকট। শিক্ষার্থীদের দাবির জন্য বেশি অর্থ দরকার। কিন্তু একই সময়ে সরকারকে ব্যয় কমাতে হচ্ছে। কারণ, ঋণ কমানো এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও কমতে পারে।

ঋণ সামলাতে গিয়ে বাড়ছে সামাজিক চাপ

ফ্রান্সে আর্থিক সংকটের সঙ্গে সামাজিক আন্দোলনের সম্পর্ক নতুন নয়। ২০২৩ সালে অবসরের বয়স বাড়ানোর উদ্যোগ ঘিরে দেশজুড়ে বড় বিক্ষোভ হয়েছিল। এবারও সরকারের আর্থিক সিদ্ধান্ত নিয়ে একই ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।

গত সপ্তাহে সরকার ২০২৭ সালের বাজেট ঘাটতি কমাতে ব্যয় কমানো ও কর বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু আগামী বছর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলে সংসদে এসব পদক্ষেপ কতটা কার্যকরভাবে পাস হবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দুশ্চিন্তা আছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাখোঁ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিচ্ছেন। ফাইল ছবি / রয়টার্সবাজারের এই উদ্বেগ ইতিমধ্যে ফরাসি বন্ডের দামে দেখা গেছে। ফ্রান্স ও জার্মানির সরকারি বন্ডের সুদের ব্যবধান ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অর্থাৎ জার্মানির তুলনায় ফ্রান্সকে ঋণ দিতে বিনিয়োগকারীরা বেশি সুদ চাইছেন।

এটি ফ্রান্সের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। কারণ, সরকারের ঋণের সুদ যত বাড়বে, নতুন করে ঋণ নেওয়ার খরচও তত বাড়বে। তখন বাজেটের আরও বেশি অর্থ শুধু ঋণের সুদ পরিশোধেই চলে যাবে।

ইউরোপে কেন উদ্বেগ

ফ্রান্সের সমস্যা শুধু ফ্রান্সের মধ্যেই সীমিত থাকার আশঙ্কা নেই। দেশটির অর্থনীতি বড় হওয়ায় এর আর্থিক সংকট ইউরোপের অন্য দেশগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে ফ্রান্সের বন্ডের সুদ দ্রুত বাড়লে ইতালি, স্পেনসহ বেশি ঋণ থাকা ইউরোপীয় দেশগুলোর বন্ড বাজারেও চাপ বাড়তে পারে। বিনিয়োগকারীরা তখন অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জার্মান বন্ডের দিকে ঝুঁকতে পারেন।

এমন আশঙ্কার কারণে ইউরোর ওপরও চাপ তৈরি হয়েছে। সোমবার ইউরো ডলারের বিপরীতে ২০২৫ সালের মে মাসের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে নেমেছিল। বুধবারও ফ্রান্সের আর্থিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কারণে ইউরোর দর কমেছে।

এ কারণেই বিশ্লেষকেরা ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতিকে ইউরোপের জন্য বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন। তবে এটি এখনই ইউরোজোনের বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে—এমন নয়। বরং আশঙ্কা হলো, পরিস্থিতি সামলাতে ব্যর্থ হলে সংকট অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সুদের হার বাড়লে চাপ যাবে সাধারণ মানুষের ওপরও

সরকারি বন্ডের সুদ বাড়ার প্রভাব শুধু সরকারের ওপর পড়ে না। এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।

ঋণের খরচ বাড়লে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ দেওয়ার খরচও বাড়ে। ফলে বাড়ি বা গাড়ি কেনার ঋণ ব্যয়বহুল হতে পারে। ব্যবসার বিনিয়োগ কমে যেতে পারে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিও ধীর হতে পারে।
প্যারিসে পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোটের আগে ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদ ভবন। ফাইল ছবি / রয়টার্সএকই সঙ্গে সরকারকে ব্যয় কমানোর পথে যেতে হতে পারে। কিন্তু ব্যয় কমালে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সরকারি কর্মী ও সাধারণ মানুষের বিভিন্ন দাবিতে অর্থ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফ্রান্সে এখন এই দুই চাপই একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা আরও অর্থ চাইছেন। সরকার চাইছে ব্যয় কমাতে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে ব্যবধানই বিক্ষোভকে আরও জটিল করে তুলছে। গত কয়েক সপ্তাহে আন্দোলন আরও বড় হয়েছে এবং হাজারের বেশি স্কুল কোনো না কোনোভাবে এর প্রভাবে পড়েছে বলে সিএনএন জানিয়েছে।

সামনে নির্বাচন, তাই সংকট আরও রাজনৈতিক

ফ্রান্সের আর্থিক সংকটের সঙ্গে এখন রাজনীতিও জড়িয়ে গেছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে। ফলে বাজেট কমানো বা কর বাড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া রাজনৈতিকভাবে আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

সরকার যদি ব্যয় কমায়, তাহলে জনঅসন্তোষ বাড়তে পারে। আবার ব্যয় কমাতে না পারলে ঋণ ও সুদের চাপ আরও বাড়তে পারে। এই দ্বন্দ্বই ফ্রান্সের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা।
প্যারিসে বিক্ষোভে স্লোগান দিচ্ছে একদল শিক্ষার্থী। ফাইল ছবি / রয়টার্সবর্তমানে ইউরোপের অর্থনীতিতে কিছু ইতিবাচক লক্ষণও আছে। উৎপাদন ও সেবা খাতে কার্যক্রম বাড়ছে। জার্মানির প্রতিরক্ষা ব্যয়, ইউরোপীয় রপ্তানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগও অর্থনীতিকে কিছুটা সহায়তা করছে।

কিন্তু উচ্চ সুদের হার এই পুনরুদ্ধারকে দুর্বল করে দিতে পারে। ফ্রান্সের বন্ড বাজারে সাম্প্রতিক চাপ তাই শুধু একটি দেশের বাজেটের সমস্যা নয়। এটি ইউরোপের অর্থনীতি কতটা ঋণের চাপ সামলে সামনে এগোতে পারবে, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।

সূত্র : সিএনএন