গাজায় ইসরায়েলের হামলা শুরুর পর থেকে ৮০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি শিক্ষক নিহত হয়েছেন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি শিক্ষক। এ ছাড়া ১৭০-এর বেশি শিক্ষক এখনো আটক রয়েছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসের আগে রবিবার (৪ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে এসব তথ্য জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। প্রতিবছর ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের শিক্ষকরা শিক্ষার অধিকার রক্ষায় ‘বাস্তব বেঁচে থাকার লড়াই’ চালিয়ে যাচ্ছেন। মন্ত্রণালয়ের দাবি, ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে শিক্ষক ও শিক্ষা খাতকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজা ও পশ্চিম তীরের শিক্ষা খাত ‘ব্যাপক গণহত্যার’ শিকার হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৭০-এর বেশি শিক্ষক এখনো ‘কঠোর পরিস্থিতির’ মধ্যে আটক রয়েছেন।
এ ছাড়া পশ্চিম তীরে শত শত চেকপয়েন্টে চলাচলের ওপর বিধিনিষেধ ও হয়রানি শিক্ষকদের দৈনন্দিন দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে হেবরনের দক্ষিণে মাসাফের ইয়াত্তা, পশ্চিম তীরের মধ্যাঞ্চলের আল-মুগাইয়ির গ্রাম, জর্ডান ভ্যালি এবং ‘এরিয়া সি’ হিসেবে চিহ্নিত এলাকাগুলোতে শিক্ষকরা বেশি সমস্যার মুখে পড়ছেন।
১৯৯৫ সালের অসলো-২ চুক্তির আওতায় পশ্চিম তীরকে এ, বি ও সি—এই তিনটি এলাকায় ভাগ করা হয়েছিল। ওই চুক্তিটি একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে করা হয়েছিল।
এরিয়া এ এলাকায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বেসামরিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ করে। এরিয়া বি এলাকায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনা করে এবং নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ ইসরায়েলের হাতে। আর এরিয়া সি পশ্চিম তীরের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত। এই এলাকায় ইসরায়েল পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে।
মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি শিক্ষকদের ওপর নির্যাতনের পাশাপাশি তাদের তীব্র আর্থিক সংকটের মধ্যেও পড়তে হচ্ছে। ইসরায়েল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের করের অর্থ আটকে রাখায় শিক্ষকদের আর্থিক ও মানসিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই অর্থ ‘ক্লিয়ারেন্স রেভিনিউ’ নামে পরিচিত। আমদানি করা পণ্যের ওপর ইসরায়েল ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হয়ে যে কর আদায় করে, সেগুলোই ক্লিয়ারেন্স রেভিনিউ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৪ সালের প্যারিস প্রটোকলের আওতায় ইসরায়েল এসব অর্থ সংগ্রহ করে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে।
২০১৯ সালে ইসরায়েল এসব রাজস্ব থেকে অর্থ কেটে নেওয়া শুরু করে। পরে অর্থ হস্তান্তর বন্ধ করে দেয় দেশটি। এতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের আর্থিক সংকট আরও গভীর হয় এবং সরকারি কর্মীদের পুরো বেতন দেওয়ার সক্ষমতাও কমে যায়।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মোট সরকারি রাজস্বের প্রায় ৫৬ শতাংশ আসে এই ক্লিয়ারেন্স রেভিনিউ থেকে। ফলে এসব অর্থ আটকে রাখার কারণে সরকারি কর্মীদের বেতন দেওয়া, সরকারি সেবা চালু রাখা এবং সরকারের অন্যান্য আর্থিক দায় পূরণ করা বড় বাধার মুখে পড়েছে।
ফিলিস্তিনি শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষক ও শিক্ষা খাতে চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ এবং শিক্ষা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা খাতের কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা দিতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে চলমান লঙ্ঘন বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
এ ছাড়া আটক শিক্ষকদের মুক্তি এবং আটকে থাকা আর্থিক পাওনা পরিশোধের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষক সংগঠনগুলোর প্রতি চাপ সৃষ্টি করার আহ্বান জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। শিক্ষকদের মর্যাদার সঙ্গে জীবনযাপনের সুযোগ নিশ্চিত করতে এসব পদক্ষেপ জরুরি বলেও উল্লেখ করেছে তারা।