আগামী ৫ থেকে ১২ অক্টোবরের মধ্যে এবারের নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে। আগামী সোমবার (৫ অক্টোবর) বাংলাদেশ সময় বিকেল সাড়ে ৩টায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে এ বছর আয়োজনটি শুরু হতে যাচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছর জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে ঘোষণা দেন, তিনি ৭টি যুদ্ধ থামিয়েছেন এবং এ কারণে তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জোর প্রচারণা চালিয়েও এই পুরস্কারের দেখা পাননি ট্রাম্প।
এবার এসে বাস্তবতা এখন ভিন্ন। ‘অশান্তির’ পথে হেঁটে প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ কারণে এবার ট্রাম্পের শান্তিতে নোবেল পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। যদিও বিজয়ী নির্বাচনের দায়িত্বে থাকা সংস্থাটির সিদ্ধান্তে ট্রাম্পের প্রভাব থাকবে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
নজিরবিহীন ২০২৫
ভেনেজুয়েলার মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার ঘটনাটি এই পুরস্কারের ১২৫ বছরের ইতিহাসে ছিল নজিরবিহীন। এই পুরস্কার পাওয়ার জন্য ট্রাম্প সর্বাত্মক চেষ্টা চালান।
এমনকি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ বেশি কয়েকজন নেতা ট্রাম্পের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানান। কিন্তু দিন শেষে মাচাদোর হাতে নোবেল তুলে দেয় কমিটি।
এর কয়েক সপ্তাহ পর ‘গণতান্ত্রিক ভেনেজুয়েলা প্রতিষ্ঠার’ প্রচেষ্টায় ট্রাম্পের সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে মাচাদো তার নোবেল পদকটি ট্রাম্পকে উপহার দেন।
পুরস্কার না পেয়ে এর জন্য নরওয়েকে দায়ী করেছিলেন ট্রাম্প। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী নির্বাচনের দায়িত্ব নরওয়ের নোবেল কমিটির।
এবার কী হবে?
অসলোভিত্তিক পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হাকন গেরলোভের মতে, এ বছর ৫ সদস্যের নোবেল কমিটি পুরস্কার দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করবে। তারা এমন ব্যক্তি বা সংগঠনকে নোবেল দেবে, যারা ‘ট্রাম্পের চাপ’ সামাল দিতে পারবে।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, গত বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার নিয়ে যা ঘটেছে, তা এবারের কমিটির বিবেচনায় প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে, পুরস্কার জয়ের পর ট্রাম্পের হাতে মাচাদোর পদক তুলে দেওয়ার বিষয়টি।
তিনি আরও বলেন, কাউকে পুরস্কার দিলে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপের মুখে পড়বেন কি না, সেটা নিয়ে কমিটির উদ্বেগ থাকতে পারে। আমার মনে হয়, পুরস্কার দেওয়ার ফলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হবে কি না, সেটিও তারা বিবেচনা করবে।
যাদের নাম আলোচনায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, সার্বিক দিক বিবেচনায় এবার নোবেল পেতে পারেন এমন প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন—পোপ লিও; আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি); আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত ফ্রান্সেসকা আলবানিজ
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া প্রথম পোপ লিও বলেছেন, তিনি যুদ্ধের বিরুদ্ধে কথা বলে যাবেন। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের সমালোচনা করায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে ‘দুর্বল’ আখ্যা দিয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নিয়ে পোপের ধর্মীয় নির্দেশনা, আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সংঘাত নিরসনের পক্ষে তার অবস্থান, অভিবাসীদের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান এবং মানবিক কাজের জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পেতে পারেন।
অপরদিকে, গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যা, আগ্রাসন ও পশ্চিম তীর অধিগ্রহণের সমালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তোপের মুখে আছেন ইতালির নাগরিক ফ্রান্সেসকা আলবানিজ।
নিরাপদ বিকল্প বেছে নিতে পারে কমিটি
আগামী ৯ অক্টোবর শান্তিতে নোবেল জয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। তবে, গত বছরের ঘটনাপ্রবাহ মাথায় রেখে নোবেল কমিটি এবার একেবারে বিপরীত দিকেও যেতে পারে। ট্রাম্পকে সম্ভাব্য ক্ষোভ থেকে বাঁচতে তারা এমন কাউকে বেছে নিতে পারে, যাকে নিয়ে বিতর্কের অবকাশ কম।
সে ক্ষেত্রে সুদানের ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স রুমস’ স্বীকৃতি পেতে পারে। গৃহযুদ্ধের সময় দেশটিতে সহায়তা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠনের একটি নেটওয়ার্ক এটি।
আবার সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শিশুদের সহায়তা করায় বেসরকারি সংস্থা সেভ দ্য চিলড্রেনও নোবেল পুরস্কার পেতে পারে।
ট্রাম্পের চাপ
বছরের পর বছর ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পারস্পরিক সহাবস্থানের যে রীতিনীতি গড়ে তুলেছে, তার প্রতি এক অর্থে প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। মিত্র দেশের বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপ, ন্যাটো জোট ছেড়ে যাওয়ার হুমকি, অভিনব নিরাপত্তানীতিসহ অনেকভাবেই তিনি তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ ও ‘মেইক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ মন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন।
নোবেল কমিটির মূল্যবোধের সঙ্গে ট্রাম্পের এই দৃষ্টিভঙ্গি সাংঘর্ষিক।
ইতিহাসবিদ ওইভিন্দ স্টেনেরসেন রয়টার্সকে বলেন, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্য তাদের (শান্তিতে নোবেল জয়ী নির্বাচক) ওপর একধরনের চাপ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির এই সংকটময় সময়ে এমন একটি নোবেল দেওয়া দরকার যা উদার গণতন্ত্র, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের পক্ষে কথা বলবে।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে (আইসিসি) পুরস্কার দেওয়া হতে পারে।
বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক এই আদালতের বিরুদ্ধে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। এর প্রতিবাদ হিসেবে সংস্থাটির হাতে নোবেল তুলে দেওয়া হতে পারে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতকে (আইসিজে) পুরস্কার দেওয়া হলে তা রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির নীতিকে সমর্থন করবে।
কিন্তু নোবেল পাওয়ার আশা ছাড়েননি ট্রাম্প। এবারও কম্বোডিয়া, ইসরায়েল ও পাকিস্তানের নেতারা ট্রাম্পকে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক গেরলোভের মতে, ট্রাম্পের পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা ‘খুবই কম’।
গত বছর নরওয়ের নোবেল কমিটির ওপর ট্রাম্পের চাপ অনেককেই বিস্মিত করেছে। ফিলিপিনো-আমেরিকান সাংবাদিক ও শান্তিতে নোবেলজয়ী মারিয়া রেসা গত বছরের ঘটনাপ্রবাহ দেখে ‘আতঙ্কিত’ হয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেন।
সেপ্টেম্বরে অসলো সফরের সময় রয়টার্সকে রেসা বলেন, গায়ের জোর দেখিয়ে সবকিছু করা যায় না। কিছু মানদণ্ড রয়েছে, যা মেনে আমরা জীবনযাপন করি। ক্ষমতা থাকলেই কোনো কিছু ন্যায্য হয়ে যায় না।