ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের আটকে রাখতে তথা দমনে ভারত সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশন (ইউএসসিআইআরএফ)। যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণকারী শিখ অধিকারকর্মী জগতার সিং জোহালকে জামিন দেয়ার বিষয়টি স্বাগত জানিয়ে ভারতে ধর্ম বা বিশ্বাসের স্বাধীনতার কারণে কারাবন্দি অন্যদেরও মুক্তি নিশ্চিত করতে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি।
ইউএসসিআইআরএফ জানিয়েছে, ধর্ম বা বিশ্বাসের স্বাধীনতার কারণে কারাবন্দি অনেকেই কমিশনের ‘ফ্রাঙ্ক আর. উলফ ফ্রিডম অব রিলিজিয়ন অর বিলিফ ভিক্টিমস লিস্ট’ বা ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের তালিকায় রয়েছেন। জগতার সিং জোহালও ওই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত।
কমিশনের চেয়ার আসিফ মাহমুদ বলেন, প্রায় ৯ বছর বেআইনিভাবে ও খেয়ালখুশিমতো আটক রাখার পর জগতার সিং জোহালকে জামিন দেয়ার বিষয়ে নয়াদিল্লি হাইকোর্টের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানায় ইউএসসিআইআরএফ। তবে তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হতে পারবেন কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জামিনের শর্ত অনুযায়ী জোহালকে তার পাসপোর্ট জমা দিতে হয়েছে এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আনা আটটি অভিযোগের কারণে এখনো মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে।
২০১৭ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ ‘আনলফুল অ্যাক্টিভিটিজ প্রিভেনশন অ্যাক্ট’ (ইউএপিএ)-এর আওতায় হত্যা ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে জোহালকে গ্রেপ্তার করে। প্রতিবেদনে এসব অভিযোগকে মিথ্যা ও গ্রেপ্তারকে অন্যায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জাতিসংঘের কয়েকজন স্পেশাল র্যাপোর্টিয়ার এই আইনকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও ভারতের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে অভিহিত করেছেন।
গ্রেপ্তারের আগে জোহাল ভারতের শিখ সম্প্রদায়ের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে ব্লগ লিখেছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এ ধরনের কর্মকাণ্ড সুরক্ষিত।
এদিকে ৯ বছর ধরে আটক রাখা হলেও আটকের পুরো সময়জুড়ে জোহালের বিচার প্রক্রিয়ায় ক্রমাগত বিলম্ব হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘ তার কারাবাসকে ‘খেয়ালখুশিমতো নির্বিচারে আটক রাখা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অতি সম্প্রতি জাতিসংঘ এটিকে ‘মানসিক নির্যাতন’-এর শামিল বলে বর্ণনা করেছে।
এছাড়া জোহাল অভিযোগ করেছেন, কর্তৃপক্ষ তাকে বৈদ্যুতিক শক দিয়েছে, দীর্ঘ সময় ঘুম থেকে বঞ্চিত রেখেছে, যন্ত্রণাদায়ক ভঙ্গিতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখেছে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছে। এসব শারীরিক নির্যাতনের কারণে শেষ পর্যন্ত তাকে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি।
ইউএসসিআইআরএফ মার্কিন সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, ভারতীয় কর্মকর্তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে জোহালের আটক ও তার সঙ্গে করা আচরণের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত নিশ্চিত করা হোক। একই সঙ্গে ‘আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা আইন’ অনুযায়ী এ ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনারও আহ্বান জানিয়েছে কমিশন।
ইউএসসিআইআরএফের ভাইস চেয়ার সিসি হেইল বলেন, জোহালের ঘটনা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কণ্ঠরোধ বা কারাবন্দি করার ক্ষেত্রে ভারত সরকারের অনুসৃত একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে অংশ নেয়ার কারণে উমর খালিদ ও শারজিল ইমামসহ আরও কয়েকজন বন্দি এখনো বিচার-পূর্ববর্তী আটকাবস্থায় রয়েছেন। মূলত ধর্ম বা বিশ্বাসের স্বাধীনতার অধিকার চর্চার কারণেই এসব মানুষকে কারাবন্দি করে রেখেছে ভারত।
সিসি হেইল আরও বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত সরকার উত্তর আমেরিকায় শিখ সম্প্রদায়ের সদস্যদের হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মতো কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করেছে। প্রবাসীদের ভয় দেখানো, জোরপূর্বক বাধ্য করা ও হয়রানি করার উদ্দেশ্যে চালানো এসব কার্যক্রম আন্তঃসীমান্ত দমন-পীড়নের সুস্পষ্ট উদাহরণ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারের ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত, অব্যাহত ও চরম মাত্রার অধিকার লঙ্ঘনের দায়ে ভারতকে ‘কান্ট্রি অব পার্টিকুলার কনসার্ন’ (সিপিসি) বা ‘বিশেষ উদ্বেগের দেশ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কাছে সুপারিশ করেছে ইউএসসিআইআরএফ।
এছাড়া ইউএসসিআইআরএফ চলতি বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত ‘ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার অবনতি’ (Deteriorating Religious Freedom Conditions in India) শীর্ষক শুনানিতে এবং এরপর আগস্টে প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া কান্ট্রি ব্রিফ’ (India Country Brief) নথিতে ভারতে ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথাও তুলে ধরেছিল।