জাতিসংঘে ভাষণ দিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুক্তরাষ্ট্র সফর এবার অস্বাভাবিকভাবে সংক্ষিপ্ত। গত বছরের এক সপ্তাহের সফরের সঙ্গে এবারের সফরের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। গত বছর সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন তিনি। যার ফলে এবারের পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রতিফলন বলে মনে করা হচ্ছে।
ইসরায়েলের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নেতানিয়াহু নিউইয়র্কে আট ঘণ্টারও কম সময় অবস্থান করবেন। এরপর তিনি ইসরায়েলে ফিরে যাবেন।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, তিনি ৯ জন বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠক করবেন। তাদের মধ্যে পাঁচজন লাতিন আমেরিকার দেশের নেতা। ইউরোপের ঐতিহ্যবাহী অংশীদারদের সঙ্গে গাজা যুদ্ধ ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে লাতিন আমেরিকার এসব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে ইসরায়েল।
তবে জাতিসংঘের বার্ষিক সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করবেন—এমন কোনো তথ্য তার কার্যালয়ের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়নি।
সামনে কঠিন নির্বাচন
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন বলেছেন, ইসরায়েলের কোনো প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক না করে ফিরে গেছেন, এমন ঘটনা তার মনে পড়ে না। ২৭ অক্টোবরের ইসরায়েলি সাধারণ নির্বাচনের আগে তিনি এটিকে নেতানিয়াহুর জন্য একটি ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করেন।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে আটবার বৈঠক করেছেন। তাদের সর্বশেষ বৈঠক হয়েছিল জুলাইয়ে।
ওরেন বললেন, ‘এটি একটি নির্বাচনী প্রচারণার ভাষণ। এখন এই প্রচারণার ভাষণের সঙ্গে যদি প্রেসিডেন্ট, অন্য কোনো বিশ্বনেতা কিংবা অন্তত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একটি বৈঠক থাকত, তাহলে অনেক ভালো হতো। কিন্তু দৃশ্যত তা হচ্ছে না।’
তিনি আরও বললেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রে এসে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেননি—এমন সময়ের কথা আমার মনে পড়ে না। তাই আমি নিশ্চিত, তিনি এতে হতাশ হয়েছেন।’
নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, সফর চলাকালে অনেক বিশ্বনেতা তার সঙ্গে বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ‘ব্যস্ত সময়সূচি এবং ইহুদি ধর্মীয় উৎসব সুক্কত শুরু হওয়ার আগে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কারণে প্রধানমন্ত্রী তাদের মধ্যে কয়েকজনের সঙ্গে বৈঠকের সময় বের করতে পেরেছেন।’
ওরেনের মন্তব্যের বিষয়ে জানতে নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
মতামত জরিপগুলোতে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, নির্বাচনে নেতানিয়াহু হেরে যেতে পারেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে নির্বাচনে হারার বিষয়টি নিশ্চিত ধরে নেওয়া যাচ্ছে না।
নেতানিয়াহুর কার্যালয় জানিয়েছে, তিনি আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, পানামা, ইথিওপিয়া ও কলম্বিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এবং গ্রিস, স্লোভেনিয়া ও পাপুয়া নিউগিনির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন।
ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন। তবে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই সংঘাত থেকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করার সময় দুই মিত্রের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। জুনে ওয়াশিংটন তেহরানের সঙ্গে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে পৌঁছায়। ইসরায়েল ওই চুক্তির বিরোধিতা করেছিল। কয়েক সপ্তাহ পর চুক্তিটি ভেঙে যায়।
গাজা যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের জনসমর্থন কমেছে, বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে। ৭ অক্টোবরের হামলার জবাবে গাজায় যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে ইসরায়েল ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে একসময় ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। এতে ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ছিল তুলনামূলকভাবে সংযত।