Image description

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বের প্রায় সব দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান অংশ নেন। কিন্তু তাদের বসার আসন কিংবা বক্তব্য দেওয়ার ক্রম ইচ্ছামতো নির্ধারিত হয় না। এর জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম ও দীর্ঘদিনের রীতি।

সাধারণ পরিষদের অধিবেশন কক্ষে সদস্য দেশগুলোর আসন সাধারণত ইংরেজি বর্ণমালার ক্রম অনুযায়ী সাজানো হয়। তবে প্রতি বছর প্রথম আসনের জন্য একটি দেশ লটারির মাধ্যমে বেছে নেওয়া হয়। ওই দেশ থেকেই ইংরেজি বর্ণানুক্রমে পরের দেশগুলোর আসন নির্ধারণ শুরু হয়।

অর্থাৎ, প্রথম আসনটি কোনো দেশের রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থনৈতিক শক্তি বা রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদার ভিত্তিতে দেওয়া হয় না। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এ ক্ষেত্রে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কোনো মর্যাদাগত পার্থক্য না রাখার নীতি মেনে চলে।

তাই কোনো বছর ‘এ’ দিয়ে শুরু হওয়া দেশের নাম প্রথমে নাও থাকতে পারে। লটারিতে যে দেশ নির্বাচিত হয়, তার নাম দিয়েই সেই বছরের আসন বিন্যাস শুরু হয়।
লটারি জিতে এবারের অধিবেশনে সবার আগে আসন পেয়েছে মরক্কো। ছবি : সংগৃহীতজাতিসংঘের নথিতে এ লটারির আয়োজনের কথা উল্লেখ রয়েছে। এরপর অন্য দেশগুলোর আসন ইংরেজি বর্ণানুক্রমে সাজানো হয়।

সাধারণ পরিষদ হলের পোডিয়াম থেকে দেখলে সামনের সারির ডানদিকের প্রান্তের আসনটিই প্রথম সারি প্রথম আসন।

৮১তম সাধারণ অধিবেশনের জন্যও প্রথম আসন নির্ধারণে লটারি হয়েছে। এ অধিবেশনে প্রথম আসনটিতে জিতেছে মরক্কো। আসন অলংকৃত করছেন মরক্কোর প্রধানমন্ত্রী।

১৯৪৬ সালে ব্রাজিল প্রথম সারির প্রথম আসনটি লটারিতে জয়লাভ করেছিল। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ন কমিটিগুলোর ক্ষেত্রেও একই ক্রম অনুসরণ করা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের আসনও এই একই নিয়মের অধীন। বাংলাদেশের ইংরেজি নাম ‘Bangladesh’ হওয়ায় ‘B’ অক্ষরের ক্রমে দেশটির আসন নির্ধারিত হয়। ফলে কোন দেশ প্রথম আসন পেয়েছে, তার ওপর বাংলাদেশের আসনের অবস্থানও কিছুটা বদলে যায়।

রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা সাধারণ পরিষদের কক্ষে নিজ নিজ দেশের নির্ধারিত আসনে বসেন। আনুষ্ঠানিক অধিবেশনে সাধারণ পরিষদের সভাপতি, জাতিসংঘের মহাসচিব ও সচিব পোডিয়ামে বসেন। এরপর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেন।

ফিলিস্তিনের ক্ষেত্রেও সাম্প্রতিক পরিবর্তন এসেছে। ২০২৪ সালের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৭৯তম অধিবেশন থেকে ফিলিস্তিনকে সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ইংরেজি বর্ণানুক্রমে বসার অধিকার দেওয়া হয়েছে। তবে ফিলিস্তিন এখনো জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য রাষ্ট্র নয় এবং সাধারণ পরিষদে ভোট দেওয়ার অধিকারও নেই।

প্রথম বক্তা কেন ব্রাজিল


তবে, আসন বিন্যাসের মতো সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেওয়ার ক্রম পুরোপুরি বর্ণানুক্রমিক নয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে ঐতিহ্যগতভাবে প্রথম বক্তব্য দেয় ব্রাজিল। এরপর বক্তব্য দেন আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘ নিজেও এই রীতির কথা উল্লেখ করেছে।

এই রীতির পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রথা। জাতিসংঘের নথিতে দেখা যায়, ১৯৫০-এর দশক থেকেই সাধারণ বিতর্কের শুরুতে ব্রাজিলের বক্তব্য দেওয়ার রীতি চালু রয়েছে। পরবর্তী কয়েক দশকের অধিবেশনেও ব্রাজিল প্রথম বক্তা হিসেবে বক্তব্য দিয়েছে।

বরাবরের মতো এবারও প্রথম ভাষণ দিয়েছেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা। ছবি : রয়টার্সএরপর দ্বিতীয় বক্তা হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য দেওয়ার রীতিও দীর্ঘদিনের। এর একটি কারণ হলো, জাতিসংঘের সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থিত। ফলে আয়োজক দেশ হিসেবে সাধারণ বিতর্কের শুরুতেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা প্রতিনিধি বক্তব্য দেন।

তবে ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের পর বক্তৃতার ক্রম বর্ণানুক্রমে নির্ধারিত হয় না। কে রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান হিসেবে আসছেন, কোন দেশ কখন বক্তব্য দেওয়ার আগ্রহ জানিয়েছে এবং সামগ্রিক কর্মসূচিতে কীভাবে ভারসাম্য রাখা হবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়।

সব মিলিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন বিন্যাস ও বক্তব্যের ক্রমে দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। আসনের ক্ষেত্রে প্রতি বছর লটারি দিয়ে একটি দেশের নাম বেছে নিয়ে সেখান থেকে ইংরেজি বর্ণানুক্রমে বিন্যাস শুরু হয়। আর সাধারণ বিতর্কের প্রথম দুই বক্তা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের রীতি চলে আসছে।