Image description

ইতিহাসের মোড়ে দাঁড়িয়ে কখনও কখনও পুরনো সিদ্ধান্তের দিকে ফিরে তাকাতে হয়: দেশের নিরাপত্তা কোন পথে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত? ব্রিটেনে এখন সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার আগ্রাসী কৌশল এবং যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার আবহে নতুন এক জনমত সমীক্ষা বলছে, ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার পক্ষে রয়েছেন বহু ব্রিটিশ নাগরিক, এমনকি ব্রেক্সিট সমর্থকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও।

শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) ব্রিটিশ গবেষণা সংস্থা সাভান্তা-র নতুন জনমত সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের প্রায় অর্ধেক ভোটার মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, ব্রেক্সিটকে সমর্থন করেছিলেন এমন ভোটারদের মধ্যেও প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৪ জন ইউরোপের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্কের পক্ষে মত দিয়েছেন। খবর দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর৷

এই জনমত সামনে আসার পর ব্রিটেনের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে শুরু হয়েছে বিতর্ক, ব্রেক্সিটের পর তৈরি হওয়া নীতিগত দূরত্ব কি জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

শনিবার ব্রাইটনে লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের বার্ষিক সম্মেলনে দলটির নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, ভ্লাদিমির পুতিনের রাশিয়া এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত অবস্থানের মধ্যে ব্রেক্সিট-পরবর্তী কিছু ‘লাল রেখা’ ধরে রাখা দেশের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা দাবি করেছেন, ব্রিটেনের উচিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে একটি নতুন বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় একক বাজারে পুনরায় যোগদানের বিষয়টি বিবেচনা করা এবং একটি যৌথ নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করা।

দলটির বক্তব্য, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্রিটেন একা নয়, বরং ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমেই নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে।

লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের এই অবস্থান অবশ্য বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় একক বাজারে ফেরার প্রস্তাব ব্রেক্সিটের মূল লক্ষ্য ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংঘাত তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিরোধীরা।

এর মধ্যেই ব্রিটেনের প্রাক্তন শীর্ষ রাজনীতিকদের কয়েক জনও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়েছেন। প্রাক্তন লেবার নেতা লর্ড কিনক এবং প্রাক্তন কনজারভেটিভ অর্থমন্ত্রী জর্জ অসবর্ন বলেছেন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও জাতীয় স্বার্থের জন্য ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক প্রয়োজন।

অসবর্নসহ কয়েক জন অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞের যুক্তি, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক উন্নত হলে ব্রিটেনের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তবে ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে ভিন্ন অবস্থান জানানো হয়েছে। সরকারের এক মুখপাত্র বলেছেন, ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে “উচ্চাকাঙ্ক্ষী সম্পর্ক” গড়ে তুলছে, যার লক্ষ্য জাতীয় নিরাপত্তা শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন সুযোগ তৈরি করা।

সরকারের দাবি, ব্রেক্সিটের সিদ্ধান্ত বজায় রেখেই ইউরোপের সঙ্গে সহযোগিতার নতুন পথ তৈরি করা সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে. ন্যাটো, রাশিয়ার হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে ব্রিটেনে প্রতিরক্ষা নীতি নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়েছে।

ব্রেক্সিটের কয়েক বছর পর তাই প্রশ্ন উঠছে, ইউরোপ থেকে দূরে সরে যাওয়ার যে রাজনৈতিক পথ ব্রিটেন বেছে নিয়েছিল, নিরাপত্তার বাস্তবতা কি সেই পথকে নতুন করে পর্যালোচনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে?