যুদ্ধে অনেক সময় ছোট একটি কৌশলের কারণে অনেক বড় সাফল্য পাওয়া যায়। আবার একটি সামান্য ভুলেও বড় ধরনের বিপর্যয়ও ঘটতে পারে। ইয়েমেনের বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখলে এটি সহজেই বোঝা যায়। বিশেষ করে হুতি যোদ্ধারা মোখা শহরে ঢোকার পর বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়েছে।
ইয়েমেনের এই যুদ্ধে জড়িত প্রত্যেক পক্ষেরই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ বা উদ্দেশ্য রয়েছে। হুতি, সৌদি আরবের সমর্থন পাওয়া গোষ্ঠী এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সমর্থন পাওয়া দলগুলোর মধ্যে এই পার্থক্য খুব স্পষ্ট। কেউ এই যুদ্ধকে শুধু নিজেদের এলাকার বিষয় হিসেবে দেখছে। আবার কেউ এটি নিয়ে আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ক্ষমতার হিসাব-নিকাশ করছে।
মোখা শহর ও এর আশপাশের দ্বীপগুলোতে এখন যে লড়াই চলছে, তাকে শুধু একটি শহর দখলের লড়াই ভাবলে ভুল হবে। এটি মূলত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ ও পণ্য সরবরাহের রাস্তাগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার এক বড় লড়াই।
মোখা শহরের আসল গুরুত্ব
একটি সাধারণ বন্দর হওয়ার চেয়েও মোখা শহরের ভৌগোলিক গুরুত্ব অনেক বেশি। ইয়েমেনের তাইজ শহর থেকে সমুদ্র উপকূলে যাওয়ার প্রধান রাস্তা এটিই। এই পথ দিয়েই জুবাব শহর হয়ে বাব এল-মান্দেব প্রণালিতে পৌঁছানো যায়। আর এই বাব এল-মান্দেব হলো বিশ্বের সবচেয়ে ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর একটি।
হুতিদের এই অগ্রগতির কারণে ইয়েমেনের ভেতরের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি পণ্য সরবরাহের সাপ্লাই লাইন বন্ধ হয়ে গেছে। এ কারণেই মোখা শহরের পতন ইয়েমেনের ভেতরের রাজনীতি ও সামরিক ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
এই অঞ্চলটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, হুতিদের এই সাফল্য আসলে ইরান ও তাদের মিত্রদের ক্ষমতা বাড়ারই পরিষ্কার লক্ষণ। বাব এল-মান্দেব ও হরমুজ—এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর চাপ তৈরি করতে পারায় ইরান এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক ভারসাম্যে ইরান এগিয়ে গেল।
সৌদি জোটের কৌশলগত বিপর্যয়
মোখা শহরের পতন সৌদি আরব ও তার মিত্রদের জন্য ছোটখাটো কোনো ধাক্কা নয়। এটি তাদের সামরিক শক্তির বড় একটি দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। হুতিরা এখন মোখা পার হয়ে জুবাব শহরে পৌঁছে গেছে। এখান থেকে বাব এল-মান্দেব প্রণালি সরাসরি দেখা যায়।
এর ফলে এই যুদ্ধ এখন আর শুধু একটি শহর বা বন্দরের মধ্যে আটকে নেই। এটি এখন বিশ্বের অন্যতম প্রধান একটি জাহাজ চলাচলের পথ নিয়ন্ত্রণের সরাসরি লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের জন্য এটি চরম একটি কৌশলগত পরাজয়।
বর্তমান পরিস্থিতিটি তিনটি দিক থেকে বিবেচনা করা দরকার। প্রথমত, যুদ্ধের মাঠ ও এলাকাগুলো কাদের দখলে যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, বাব এল-মান্দেব উপকূল ব্যবহার করে সমুদ্রপথে বাণিজ্য, যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী জাহাজের জন্য হুমকি তৈরি করার ক্ষমতা হুতিদের কতটা বেড়েছে।
তৃতীয়ত, ইরান ও তাদের শত্রুদের মধ্যকার বড় লড়াইয়ে বাব এল-মান্দেবকে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হওয়া।
রণক্ষেত্রে কার কী অবস্থা?
সামরিক দিক দিয়ে হুতিরা বেশ কয়েকটি বড় সাফল্য পেয়েছে। তারা হোদেইদার দক্ষিণের এলাকাগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ শক্ত করেছে। মোখা দখলের মাধ্যমে তারা শত্রুপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ একটি কমান্ড ও সাপ্লাই সেন্টার নিজেদের দখলে নিয়েছে। এখন তারা সরাসরি বাব এল-মান্দেব প্রণালির সামনে দাঁড়িয়ে। এর ফলে সমুদ্রে জাহাজ চলাচলের ওপর তাদের পুরো নিয়ন্ত্রণ না থাকলেও, নজরদারি করা ও হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা অনেক বেড়ে গেছে।
অন্যদিকে, সৌদি আরব ও তার মিত্ররা হুতিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় বড় ধরনের হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের লক্ষ্য হলো হুতিদের দুর্বল করে দেওয়া।
কিন্তু এই অভিযানগুলো বরং সৌদি জোটের সামরিক কৌশলের চরম ব্যর্থতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। তারা জোটবদ্ধ হয়ে সঠিক কোনো সামরিক কৌশল তৈরি করতে পারেনি। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকেই হুতিরা তাদের সামরিক শক্তি এবং নিখুঁত হামলার প্রমাণ দিয়ে আসছে। কিন্তু সৌদি আরব সম্ভবত এই বিষয়টি বুঝতে পারেনি।
হুতিদের সামনের চ্যালেঞ্জ
তবে এই সাফল্যের কারণে হুতিরাও নতুন কিছু চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তারা যত দক্ষিণের দিকে এগোচ্ছে, তাদের সাপ্লাই লাইন তত লম্বা হচ্ছে। ফলে বিমান হামলা ও পাল্টা হামলার ঝুঁকিও বাড়ছে। এছাড়া মোখা ও জুবাব শহর দখলে নেওয়ার মানে হলো নতুন এলাকা পরিচালনা করা, রাস্তাঘাট ও বন্দর নিরাপদ রাখা এবং সেখানকার বাসিন্দা ও আশ্রয়হীন মানুষদের সমস্যাগুলো সামলানো। শুধু সামরিক আক্রমণ করার চেয়ে এটি অনেক বেশি কঠিন কাজ।
অন্যদিকে, হুতিদের বিরোধীদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো তারা একজোট নয়। তাদের সবার শত্রু এক হলেও উদ্দেশ্য এক নয়। এই জোটে আছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার, তারেক সালেহের বাহিনী, দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী দল এবং সৌদি আরব ও ইউএই-এর মতো দেশগুলো।
এদের কেউ চায় একটি অখণ্ড ইয়েমেন রাষ্ট্র গড়তে, কেউ চায় শুধু দক্ষিণাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ। আবার কারও নজর শুধু বন্দর ও উপকূলগুলোর দিকে। জোটের এই বিভেদের কারণেই হুতিরা এত দ্রুত সামনের দিকে এগোতে পেরেছে। যুদ্ধ যত বেশি বাব এল-মান্দেব কেন্দ্রিক হচ্ছে, বিরোধীদের এই বিভক্তির কারণে তাদের তত বেশি মাশুল গুনতে হচ্ছে।
আঞ্চলিক শক্তির পালাবদল ও বিশ্ব অর্থনীতির শঙ্কা
হুতিদের এই অগ্রগতির কারণে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির রাস্তা সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে এমনিতেই ইরানের প্রভাব রয়েছে। এখন বাব এল-মান্দেবেও যদি একই পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে সৌদি আরব দুই দিক থেকেই আটকা পড়বে।
খবর অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হুতিদের ওপর সরাসরি হামলা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এখনই সরাসরি কোনো যুদ্ধে জড়াতে চায় না। তারা শুধু গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে রাজি। ফলে সৌদি আরবকে হয়তো বাধ্য হয়েই বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের জন্যও এটি একটি বড় ধাক্কা। ইয়েমেনের উপকূলে নিজেদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তারা যে পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ করেছিল, তা এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে।
মিসরের জন্যও হুতিদের এই অগ্রগতি বিশাল একটি ভয়ের কারণ। জাহাজগুলো যদি বাব এল-মান্দেব এড়িয়ে আফ্রিকার ‘কেপ অফ গুড হোপ’ ঘুরে যাতায়াত করে, তবে সুয়েজ খাল থেকে মিসরের আয় মারাত্মকভাবে কমে যাবে।
বড় বিপদ কোনটি?
সবচেয়ে বড় বিপদের বিষয় হলো এমন একটি পরিস্থিতি সাধারণ বিষয়ে পরিণত হওয়া, যেখানে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী ঠিক করে দেবে কোন জাহাজ সমুদ্র দিয়ে যাবে আর কোনটি যাবে না। এর ফলে পুরো বিশ্বের ব্যবসা-বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হবে।
তবে এটি ইরানের জন্য অনেক বড় একটি কৌশলগত বিজয়। হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি এখন বাব এল-মান্দেব উপকূলেও তাদের মিত্ররা খুব শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে ইরান সরাসরি কোনো যুদ্ধে না জড়িয়েও আরব উপদ্বীপের দুই দিক থেকেই পুরো বিশ্বের ওপর চাপ তৈরি করতে পারবে।
এই পুরো পরিস্থিতির খুব খারাপ একটি প্রভাব পড়বে বিশ্ব অর্থনীতিতে। জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে বিশ্বের অনেক দেশ এমনিতেই বিপদে আছে। বাব এল-মান্দেব হাতছাড়া হলে সারা বিশ্বে জ্বালানির দাম বেড়ে যাবে, তেল-গ্যাস রপ্তানিতে বাধা আসবে এবং জাহাজের ইন্স্যুরেন্স খরচ আকাশছোঁয়া হয়ে যাবে। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ছোট একটি এলাকার এই লড়াই এখন পুরো বিশ্বের জন্যই বড় একটি বিপদের সংকেত।
(মিডলইস্ট আই থেকে লেখাটি ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)