Image description

গাজা ও ইসরায়েল-সংক্রান্ত বিষয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের উত্তরে প্রভাব ফেলতে ইসরায়েলের প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এটির লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের মতামত প্রভাবিত করা। অর্থাৎ এআই যেসব অনলাইন উৎস থেকে তথ্য নেয়, সেসব উৎসের মধ্যে নির্দিষ্ট ইসরায়েলি বয়ান বা বক্তব্য ঢুকিয়ে দেওয়া।

পলিটিকোর পর্যালোচনা করা নথির বরাত দিয়ে আরব নিউজ জানিয়েছে, এই উদ্যোগের কেন্দ্রে রয়েছে ‘হ্যানোভার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি’ নামে একটি ওয়েবসাইট।

ওয়েবসাইটটিতে গাজা, ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও ইহুদিবিদ্বেষের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে ‘ইসরায়েলি বাহিনী কি বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী?’ কিংবা ‘গাজায় ইসরায়েল কি ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে?’- এ ধরনের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে তথ্য সাজানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফরাসি জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান হাভাস মিডিয়া তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান পাইরোর মাধ্যমে এই উদ্যোগে যুক্ত ছিল। মার্কিন সরকারের কাছে জমা দেওয়া নথিতে দেখা গেছে, হ্যানোভার ইনস্টিটিউটের এক ডজনের বেশি নিবন্ধ ১ লাখ ডলারের একটি প্রচারণার অংশ ছিল।

নথিতে এই প্রচারণার উদ্দেশ্য হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে ইসরায়েল ও সংশ্লিষ্ট বিষয় সম্পর্কে তথ্যভিত্তিক ও সূত্রনির্ভর উপাদান দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে এসব প্রতিবেদনের ধরন বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। প্রচলিত মতামতধর্মী লেখা বা প্রচারণামূলক নিবন্ধের বদলে অনেক প্রতিবেদন এমন প্রশ্নের ভিত্তিতে সাজানো হয়েছে, যেভাবে মানুষ সরাসরি চ্যাটজিপিটি বা অন্য এআই চ্যাটবটকে প্রশ্ন করে।

এখানেই বিষয়টির গুরুত্ব। চ্যাটজিপিটি, পারপ্লেক্সিটি ও অন্যান্য এআই সার্চ টুল এখন ইন্টারনেটে থাকা বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সেগুলো বিশ্লেষণ ও সংক্ষেপ করে ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তর দেয়।

ফলে কোনো পক্ষ যদি নিজেদের বক্তব্য সমর্থন করে এমন তথ্যকে অনলাইনে বেশি পরিমাণে, নির্দিষ্ট কাঠামোয় এবং সহজে খুঁজে পাওয়া যায়, এমনভাবে প্রকাশ করে, তাহলে এআইয়ের উত্তরে সেই বক্তব্য উঠে আসার সম্ভাবনা বাড়তে পারে।

পলিটিকোর নিরপেক্ষভাবে করা কিছু পরীক্ষায় চ্যাটজিপিটি ও পারপ্লেক্সিটি গাজা, ইহুদিবাদবিরোধিতা ও ইহুদিবিদ্বেষ নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে হ্যানোভার ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত তথ্য উদ্ধৃত করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ওই প্রচারণা পদ্ধতিগতভাবে চ্যাটজিপিটি বা অন্য এআইয়ের ইসরায়েল-সংক্রান্ত উত্তর বদলে দিয়েছে। একইভাবে হ্যানোভার ইনস্টিটিউটের প্রতিটি লেখা এআইকে প্রভাবিত করার জন্যই তৈরি করা হয়েছিল, এমন প্রমাণও নেই।

তবে ঘটনাটি একটি নতুন প্রবণতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। কোনো সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত প্রচারণার অংশ হিসেবে তৈরি তথ্য এখন জনপ্রিয় এআই টুলগুলোর ব্যবহৃত অনলাইন উৎসের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে।

প্রচলিত বিজ্ঞাপনের সঙ্গে এর পার্থক্যও রয়েছে। বিজ্ঞাপন দেখলে ব্যবহারকারী বুঝতে পারেন সেটি প্রচারণা। কিন্তু কোনো এআই যদি সেই তথ্য নিজের উত্তরের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করে, তখন ব্যবহারকারীর পক্ষে বোঝা কঠিন হতে পারে যে তথ্যটির পেছনে কোনো রাজনৈতিক বা সরকারি প্রচারণা রয়েছে কি না।

হ্যানোভার ইনস্টিটিউটের ওয়েবসাইটে অবশ্য একটি ঘোষণা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তাদের তথ্য-উপাত্ত পাইরো হাভাস মিডিয়া জার্মানির হয়ে এবং শেষ পর্যন্ত ইসরায়েল সরকারের বিজ্ঞাপন সংস্থা লাপামের পক্ষে বিতরণ করছে।

এ ধরনের প্রচারণার সঙ্গে এআইকে কেন্দ্র করে নতুন একটি কৌশলও সামনে এসেছে, যাকে বলা হচ্ছে ‘জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন’ বা জিইও।

আগে সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশনের মাধ্যমে কোনো ওয়েবসাইটকে গুগলের সার্চ ফলাফলে ওপরে আনার চেষ্টা করা হতো। এখন একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্য, প্রতিষ্ঠান বা তথ্যকে এআইয়ের খুঁজে পাওয়া ও উদ্ধৃত করার সম্ভাবনা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

এটি শুধু ইসরায়েলের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়। ভবিষ্যতে বিভিন্ন সরকার, রাজনৈতিক দল, কোম্পানি, লবিং প্রতিষ্ঠান ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করতে পারে।

কারণ যুদ্ধ, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে তথ্য জানতে এখন অনেক মানুষ সরাসরি এআই চ্যাটবটের ওপর নির্ভর করছেন। ফলে এআইয়ের উত্তর তৈরির আগে ইন্টারনেটে কোন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে এবং কোন উৎসকে এআই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এতে তথ্যের স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। কোনো ব্যবহারকারী যদি এআইকে জিজ্ঞেস করেন, ‘গাজায় কি দুর্ভিক্ষ চলছে?’ কিংবা ‘গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলছে কি না?’- তখন তিনি ধরে নিতে পারেন যে এআই বিভিন্ন স্বাধীন উৎস থেকে তথ্য নিয়ে উত্তর দিচ্ছে।

কিন্তু সেই উৎসগুলোর কোনোটি যদি আগে থেকেই কোনো রাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত প্রচারণার অংশ হয়, তাহলে তথ্য ও প্রচারণার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যেতে পারে।

পাইরো অবশ্য তাদের কাজকে প্রতারণামূলক প্রচারণা হিসেবে দেখছে না। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল রোজেনবার্গ বলেছেন, ইসরায়েল তাদের নিয়োগ করেছিল এবং মার্কিন আইনে বিষয়টি প্রকাশও করা হয়েছে। তার দাবি, তারা ইসরায়েল সম্পর্কে সঠিক ও সূত্রনির্ভর তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরতে এবং ইসরায়েলবিরোধী ভুল তথ্য মোকাবিলা করতে কাজ করছে।

বিশ্লেষকদের কাছে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে অন্য কারণে। সংবাদপত্র, রেডিও ও টেলিভিশনের পর রাজনৈতিক প্রচারণা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সার্চ ইঞ্জিনে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন সেই প্রতিযোগিতা পৌঁছে যাচ্ছে এআইয়ের তথ্যভাণ্ডারেও।

এআই শুধু তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেয় না; বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য নিয়ে সেটিকে বিশ্লেষণ করে একটি সমন্বিত উত্তর তৈরি করে। ফলে রাজনৈতিক বয়ানের লড়াই এখন শুধু মানুষকে কী বলা হবে, তা নিয়ে নয়; এআই সেই উত্তর তৈরির সময় কোন তথ্য খুঁজে পাবে, সেটি নিয়েও।

সূত্র: আরবনিউজ