কাঁধে বহনযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে এয়ার ফোর্স ওয়ানকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে- এমন হুমকির কারণে গত মাসে তুরস্ক সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে গোপনে ছোট একটি সরকারি বিমানে তুলে দেয়া হয়। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত এক ব্যক্তি বুধবার এ তথ্য জানিয়েছেন। সূত্রটি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানিয়েছে, ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্পের আঙ্কারা সফরের শেষ দিনে ওই হুমকির উদ্ভব হয়। তখন ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা তীব্র হয়ে ওঠে। সিক্রেট সার্ভিস হুমকিটিকে বিশ্বাসযোগ্য ও আসন্ন বলে মনে করে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের গতিবিধি গোপন রাখতে নজিরবিহীন এক অভিযান চালানো হয়।
গোয়েন্দা তথ্যটি কোথা থেকে এসেছিল, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ওই সূত্র। তবে তিনি বলেছেন, কর্মকর্তাদের প্রস্তুতির জন্য হাতে খুব বেশি সময় ছিল না এবং শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনাটি করা হয়। বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত দ্বিতীয় একটি সূত্র জানিয়েছেন, ট্রাম্পের বিরোধীদের পক্ষ থেকে কীভাবে ওই হুমকি বাস্তবায়ন করা হবে, তার কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। বরং শুধু হামলার অভিপ্রায় ছিল। এ কারণেই বিমানগুলোকে উড্ডয়ন করতে দেয়া হয়েছিল।
প্রথম সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ৮ই জুলাই তুরস্ক থেকে উড্ডয়নের আগে ট্রাম্প ও তার অল্প কয়েকজন সহযোগী একটি ক্যাটারিং ট্রাকের আড়ালে গোপনে বড় নীল-সাদা প্রেসিডেন্টের বিমান থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট ও সাধারণ দেখতে সি-৩২এ বিমানে চলে যান। একই সময়ে এয়ার ফোর্স ওয়ান আলাদাভাবে উড্ডয়ন করে। ওই বিমানে ছিলেন প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা, হোয়াইট হাউসের কর্মীরা এবং সফরসঙ্গী সাংবাদিকদের দল।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানিয়েছেন, সিক্রেট সার্ভিসের নির্দেশেই তিনি বিমান বদল করেন। প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এই সংস্থার নির্দেশে তিনি আঙ্কারা থেকে বৃটেনে জ্বালানি নেয়ার জন্য একটি বিরতিস্থলের উদ্দেশে উড়াল দেন। পুরো যাত্রাই কোনো ঘটনা ছাড়াই সম্পন্ন হয়।
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন, আমার মনে হয়, আমি যে বিমানে উড়েছিলাম, সেটিই আসলে বেশি ঝুঁকির মধ্যে ছিল। কারণ আমার ধারণা, তারাই সম্ভবত ওই বিমানটিকেই লক্ষ্যবস্তু করার চেষ্টা করত। তবে এ বক্তব্যের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি।
মিচেল ইনস্টিটিউট ফর অ্যারোস্পেস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ডগলাস বার্কি বলেছেন, হুমকিটি হয়তো নতুন ধরনের তাপ-সন্ধানী ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ছিল। এসব ক্ষেপণাস্ত্র উড়োজাহাজের উত্তপ্ত ইঞ্জিনকে অনুসরণ করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে এবং সামরিক পরিকল্পনাবিদদের কাছে এগুলো নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
প্রচলিত রাডার-নির্দেশিত হুমকির তুলনায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা কঠিন। কারণ এগুলো কোনো শনাক্তযোগ্য রেডিও তরঙ্গ পাঠায় না। ফলে হঠাৎ করেই যেকোনো দিক থেকে চলে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বার্কি। তিনি জানান, ইরানের এসএ-৬৭ ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সংস্করণে সাধারণ রেল-লঞ্চার ব্যবহার করা হয় এবং এটি তাপ-সন্ধানী ও লেজার-নির্দেশনা- দুই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বলে ধারণা করা হয়। আর কাঁধে বহনযোগ্য তাপ-সন্ধানী অস্ত্র ৯কে৩৩৩ ভারবা রাশিয়ায় তৈরি।
নিরাপত্তার স্বার্থে যুদ্ধক্ষেত্র বা উচ্চঝুঁকির এলাকায় সফরের সময় ট্রাম্পসহ মার্কিন প্রেসিডেন্টরা মাঝে মাঝে গোপনে ভ্রমণ করেন। তবে সাধারণত এসব সফরের বিষয়ে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে থাকা সাংবাদিকদের আগেই জানানো হতো। ২০০৩ সালের থ্যাংকসগিভিংয়ের সময় প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের বাগদাদ সফরের আগেও কয়েকজন সাংবাদিককে আগাম জানানো হয়েছিল। তবে বুশের থ্যাংকসগিভিং ছুটি কাভার করতে টেক্সাসের ক্রফোর্ডে থাকা অন্য সাংবাদিকদের বিভ্রান্ত করা হয়েছিল। তাদের বলা হয়েছিল, বুশ পরিবারের সঙ্গে ছুটির দিনটি কাটাবেন। কিন্তু হঠাৎ বুশ ইরাকে উপস্থিত হলে তারা বিস্মিত হয়ে যান।
বুধবার প্রথম সূত্রটি জানিয়েছে, তুরস্কে সিক্রেট সার্ভিসের হাতে সেই ধরনের সময় ছিল না। সূত্রটি বলেছেন, তারা এমন একটি বিশ্বাসযোগ্য ও আসন্ন হুমকি ঠেকাতে মরিয়া হয়ে কাজ করছিল, যা তারা মনে করেছিল খুব শিগগিরই ঘটতে পারে। দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট চলতি সপ্তাহে প্রথমবারের মতো এই অভিযান সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে- ঘটনাটি ঘটে যাওয়ার এক মাসেরও বেশি সময় পর। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, আঙ্কারায় ট্রাম্প কোথায় অবস্থান করছেন, এমনকি তার হোটেলের ঠিক কোন তলায় তিনি ছিলেন- ইরানিরা তাও জানতে পেরেছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
যে এয়ার ফোর্স ওয়ান বিমানটিকে এখন প্রেসিডেন্টের জন্য একটি ‘ডিকয়’ বা বিভ্রান্তিমূলক বিমান হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেটিতে ছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। প্রথম সূত্র জানিয়েছে, পুরো কৌশল সম্পর্কে তাকে অবহিত করা হয়েছিল। ওই বিমানে আরও ছিলেন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং এবং আরও কয়েকজন সহযোগী। পাশাপাশি ছিলেন নিয়মিত ১৩ সদস্যের প্রেস পুল, যার মধ্যে রয়টার্সের একজন সংবাদদাতা ও একজন আলোকচিত্রীও ছিলেন।
প্রথম সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান কর্মকর্তা ড্যান স্ক্যাভিনো, নির্বাহী সহকারী ন্যাটালি হার্প এবং ওভাল অফিসের কার্যক্রম পরিচালক ওয়াল্ট নাউটাও ট্রাম্পের সঙ্গে ক্যাটারিং ট্রাকে করে বিমান বদল করেছিলেন। কয়েকজন গণমাধ্যম বিশ্লেষক ও আইনপ্রণেতা প্রশ্ন তুলেছেন, প্রেসিডেন্টকে বহন করছে বলে ধারণা করা বিমানটিতে ট্রাম্পের সহযোগী ও সাংবাদিকদের রেখে যাওয়ার ফলে তাদেরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছিল কি না। প্রথম সূত্রটি জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে শত্রুতা যখন আরও বাড়ছিল, তখন ট্রাম্পের নিরাপত্তার স্বার্থেই এই কৌশল গোপন রাখা সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হয়েছিল। তুরস্ক ইরানের সঙ্গে সীমান্তবর্তী হওয়ায় পরিস্থিতির ঝুঁকিও ছিল বেশি।