Image description
 
গত কয়েক দিনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ধরনে একটা স্পষ্ট পরিবর্তন দেখা গেছে। যুদ্ধের প্রথম থেকেই, সাধারণত আমেরিকা বা ইসরায়েল আগে ইরান বা লেবাননকে আঘাত করত, তারপর ইরান ও তার প্রক্সিরা জবাব দিত। এবার উল্টোটা হয়েছে।
আমেরিকা-ইসরায়েল-লেবাননের যুদ্ধবিরতি চুক্তি যা জুনের শেষে স্বাক্ষরিত ফ্রেমওয়ার্ক, স্বাক্ষরের পর হিজবুল্লাহ দক্ষিণ লেবাননের আলি আল-তাহের রিজ এলাকায় ইসরায়েলি বুলডোজারের ওপর বিস্ফোরক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় কোনও ইডিএফ সেনা হতাহত না হলেও ইসরায়েলি সেনাবাহিনী একে চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে ঘোষণা করেছে। ফলশ্রুতিতে ইসরায়েল সাউথ লেবানন এলাকায় তাদের অপারেশন অব্যাহত রেখেছে—সেখানে তারা অভিযান চালিয়ে টানেল ধ্বংস ও অস্ত্র জব্দ করেছে।
ইরাকের পিএমএফ, যারা ইরান-সমর্থিত বাহিনী, সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় একাধিক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরব ও আমেরিকা একে ইরানি নির্দেশিত আক্রমণ বলে দাবি করেছে। জবাবে সৌদি-আমেরিকান যৌথ বিমান হামলায় ইরাকের সাতটি প্রদেশে পিএমএফের ঘাঁটি ও লজিস্টিক সাইটে আঘাত হানা হয়। কমপক্ষে ২০ জন পিএমএফ সদস্য নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছে।
 
২৮ সি ফেব্রুয়ারি আমেরিকা-ইসরায়েলের যৌথ ভাবে ইরান হামলার পর এই প্রথম সৌদি আরব আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করেছে। যুদ্ধ শুরুর প্রায় পাঁচ-ছয় মাস ধরে সৌদি আরব আক্রমণ সয়ে এসেছে। ইরান-সমর্থিত হুথি ও ইরাকি মিলিশিয়ারা সৌদির তেল স্থাপনায় অনেক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। সৌদি নেতৃত্ব আক্রমণ ঠেকানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু সরাসরি যুদ্ধে নামেনি। কারণ তাদের অর্থনীতি, ভিশন ২০৩০ এবং বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীলতা। তারা চায় না পুরোপুরি আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের ফ্রন্টে পরিণত হতে।
 
ইরান সৌদিকে তার প্রক্সিদের বিপক্ষে নামাতে চেয়েছে বলে মনে করি না। ইরানের হিসাব ছিল প্রক্সি দিয়ে চাপ তৈরি করা, তেলের দাম বাড়ানো এবং সৌদিকে আমেরিকার ওপর চাপ দিতে বাধ্য করা—সরাসরি সৌদি সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে টানার নয়। সৌদিকে পুরোপুরি বিপক্ষে নামালে আরব জোট শক্তিশালী হয়ে যায়, হরমুজ নিয়ন্ত্রণের হিসাব জটিল হয় এবং আমেরিকার স্থানীয় মিত্র আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইরান চায় সৌদি “নিষ্ক্রিয়” থাকুক, শুধু আক্রমণ সয়ে যাক।
কিন্তু এবার ধৈর্য্য চুকিয়ে গেছে। গত ৭২ ঘণ্টায় ৩০টির বেশি ড্রোন হামলা হয়েছে সৌদি তেল স্থাপনায়, বিশেষ করে পূর্বাঞ্চল, রিয়াদ এলাকা, আবকাইকে । সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় স্পষ্ট বলেছে—এগুলো ইরাক থেকে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা চালিয়েছে। এবার তারা আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে ইরাকে পিএমএফের ঘাঁটিতে হামলা করে জবাব দিয়েছে। সৌদি পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে : “আমরা উত্তেজনা চাই না, কিন্তু আক্রমণের জবাব দেব।” তাদের আগের সংযমকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে—এই ধারণা ভাঙতেই তারা মাঠে নেমেছে।
 
কিন্তু সৌদি আরব একক ভাবে আক্রমণ করেনি, সাথে আমেরিকাকে নিয়েছে। পাকিস্তানকে নিয়ে কেন আক্রমণ চালায়নি, সেই আলোচনা আরেক পোস্টে করব। সৌদি নিজেও বহু ফ্রন্টে আক্রান্ত এবং হয়তো ইরানের সাথে পুরোপুরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না।
এবার আসি আমেরিকা আর ইরানের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের উপর। আমেরিকা গত চার-পাঁচ রাত ইরানের মাটিতে সরাসরি আক্রমণ বন্ধ রেখেছিল। এই বিরতির সুযোগে ইরান নিজে জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি আমেরিকান ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে; যদিও সব ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্ট করা হয়েছে। ট্রাম্প বলেছেন ইরানকে খুব কঠিনভাবে আঘাত করা হবে, ট্রাম্পের ভাষায় “beat the shit out of them”।
হঠাৎ করে ইরান এত সাহসী হয়ে উঠল কেন? তারা সম্ভবত ভাবছে আমেরিকা ও ইসরায়েল যুদ্ধের ক্লান্তিতে ভুগছে, তাই নিজ থেকে আক্রমণ কমিয়ে দিয়েছে। তাদের হিসাব হলো—বিশ্ববাজারে তেলের দাম যদি ২০০ ডলারের কাছাকাছি চলে যায়, আর নভেম্বরের হাউজ-সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকানদের মেজরিটি হারানোর ভয় ট্রাম্পকে চাপে ফেলে, তাহলে আমেরিকা পিছু হটতে বাধ্য হবে। সেই লক্ষ্যেই এই আক্রমণের ধারা।
ইরান মনে করছে তাদের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ, প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং সহনশীলতা দিয়ে তারা টিকে থাকতে পারবে, আর পশ্চিমা দিক থেকে চাপ কমে আসবে। তারা আরও ভাবছে—যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আমেরিকান জনমত ও অর্থনীতি ভেঙে পড়বে, ট্রাম্পকে ব্লিঙ্ক করতে বাধ্য করা যাবে।
 
কিন্তু বাস্তবতা অন্য রকম। তেলের দাম এখনো ৮৫-৯০ ডলারের আশেপাশে ঘুরছে, ২০০-এর কাছাকাছি যায়নি। আর ট্রাম্প নির্বাচন বা জনমতের তোয়াক্কা করছেন না। শুরুর দিকে তিনি নেতানিয়াহু, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর প্রভাবে থাকলেও এখন স্পষ্টতই নিজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং শক্তি প্রয়োগের পূর্ণ সংকল্প নিয়ে এগোচ্ছেন।
 
আমেরিকার আক্রমণাত্মক যুদ্ধক্ষমতা এখনো অটুট ও শক্তিশালী। ইতিমধ্যে তার ক্ষেপণাস্ত্র প্রডাকশন ৩-৪ গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। জুনে স্বাক্ষরিত MOU-এর পর অনেকে বলেছিলেন এটা আমেরিকার পরাজয়, ইরানের জয়। সেটা ট্রাম্পের ইগোতে লেগেছে। গত ৪০ বছর ধরে আমেরিকা ইরানকে বিচ্ছিন্ন করে নতি স্বীকার করাতে চেয়েছিল। ট্রাম্প সেই পথ ছেড়ে সরাসরি শক্তি দিয়ে ইরানকে পরাভূত করার পথ বেছে নিয়েছেন। তবে কেউ যদি তার ইগোকে প্রশমিত করতে পারে, তাহলে হয়তো পরের দিনই তিনি ভিন্ন পথ ধরবেন। কিন্তু যদি তিনি ইরানকে নতজানু করতে চান, তাহলে তার বাকি শাসনকাল ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যেতে পারে।
 
ইরানের উপর মাসের পর মাস আমেরিকা-ইসরায়েলের হামলা সত্ত্বেও ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা ধরে রেখেছে। তাদের মোজাইক ডকট্রিনে অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধে প্রক্সি নেটওয়ার্ক তাদের বিভিন্ন ফ্রন্টে যুদ্ধকে গভীরতর করেছে। ইরান দীর্ঘদিন নিষেধাজ্ঞার অধীনে থাকায় অভ্যস্ত। তাদের অর্থনীতি অনেক চাপ সহ্য করতে পারবে, প্লাস চিন আর রাশিয়া তার পক্ষে আছে। কিন্তু তেলের দাম আরও বাড়লে পশ্চিমা দেশগুলো তা বেশিদিন সহ্য করতে পারবে না, ফলে আমেরিকার উপর যুদ্ধ বন্ধের চাপ বাড়বে।
এই সব বিবেচনা করে ইরান ভাবছে যুদ্ধাবস্থায় আমেরিকা আগে ব্লিঙ্ক করবে। কিন্তু বাস্তবতা অন্য রকমও হতে পারে। হরমুজ বন্ধ, বাব আল মানদেব এ সৌদি জাহাজের নিষেধাজ্ঞা, র মাঝেও তেলের দাম এখনো ৮৫-৯০ ডলারের আশেপাশে। তার উপর ট্রাম্প নির্বাচন বা জনমতের তোয়াক্কা না করে নিজে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন এবং শক্তি প্রয়োগের সংকল্প দেখাচ্ছেন। আমেরিকাও বেশ রিসেলিয়েন্স দেখাচ্ছে।
 
ইরাক, আফগানিস্তানের মতন এই যুদ্ধ একদিন বন্ধ হবে, ইরান অ্যাসিমেট্রিক যুদ্ধ দিয়ে টিকে যাবে। তবে যুদ্ধ যদি আরও এক-দুই বছর চলে, তাহলে ইরানের অর্থনীতি ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে , আর মধ্যপ্রাচ্য জ্বলবে। সেই আগুন কীভাবে নিভবে এবং আদৌ আমেরিকান সেনার পুরা মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিদায় নেবে কিনা তা এখনও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না।
See less