ভারতে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আন্দোলনে উসকানি দিতে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশ হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অস্ত্র পাঠাচ্ছে বলে দাবি করেছেন বিতর্কিত লেখক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী।
দাবিটির সপক্ষে তিনি একটি ভিডিও প্রচার করেন যেটি পরে একই দাবিতে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে দেখা গেছে, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি।
২২ জুলাই প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট উইকলি ব্লিটজের সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী এক্সে একটি ভিডিও পোস্ট করেন।
ভিডিওটির সঙ্গে তিনি দাবি করেন, “পাকিস্তানি আইএসআই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অস্ত্র পাচার করছে! বাংলাদেশ পুলিশ কুমিল্লা-আগরতলা সীমান্ত থেকে একটি তিন চাকার যান আটক করেছে, এক মাদ্রাসার শিক্ষকের ব্যাগ তল্লাশি করে বেশ কয়েকটি বিদেশি পিস্তল উদ্ধার করেছে।”
পোস্টটির আর্কাইভ সংস্করণ দেখুন এখানে।
১৭ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে একটি মহাসড়কের পাশে কয়েকজন ব্যক্তি ও পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়। তাদের কয়েকজন দাড়ি-টুপি পরা এক ব্যক্তিকে ধরে রেখেছেন। সামনে পিস্তলসদৃশ কয়েকটি বস্তু পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ভিডিওর ভয়েসওভারে দাবি করা হয়, কুমিল্লা-আগরতলা সীমান্তে একটি তিন চাকার যান থেকে এসব অস্ত্র উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ পুলিশ। আটক ব্যক্তিকে মাদ্রাসাশিক্ষক হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়।
সালাহ উদ্দিন শোয়েব তার পোস্টে আরও দাবি করেন, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আইএসআইয়ের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র বাংলাদেশ হয়ে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাচার করছে।
শোয়েবকে সূত্র দেখিয়ে ভারতের মিডিয়ায় প্রচার
সালাহ উদ্দিন শোয়েবের পোস্টের পর একই ভিডিও ব্যবহার করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জি ২৪ ঘণ্টা।
প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে অস্ত্র পাচার করছে। বাংলাদেশ পুলিশ কুমিল্লা-আগরতলা সীমান্ত থেকে একটি তিন চাকার যান আটক করে এক মাদ্রাসাশিক্ষকের ব্যাগে কয়েকটি বিদেশি পিস্তল পেয়েছে বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনটি দেখুন এখানে।
ভারতভিত্তিক আরেক সংবাদমাধ্যম ‘এই দিন’ একই দাবি নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
এতে বলা হয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিদ্রোহ উসকে দিতে অস্ত্র পাচার করছে পাকিস্তানি আইএসআই। ভারতের নরেন্দ্র মোদী সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরাতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি বড় চক্র ষড়যন্ত্র করছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
সেখানে সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর পোস্টকে দাবিটির প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনটি পড়ুন এখানে।
সংবাদমাধ্যমের বাইরে ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে।
ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট প্রতিম রঞ্জন বোস ভিডিওটি এক্সে পোস্ট করে লেখেন, “বাংলাদেশ থেকে ভারতে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাঠানো হচ্ছে।”
পোস্টটি দেখুন এখানে।
একই দাবিতে প্রচারিত আরও পোস্ট দেখুন এখানে এবং এখানে।
ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি
দ্য ডিসেন্টের যাচাইয়ে ভিডিওটির মধ্যে এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার একাধিক দৃশ্যগত অসঙ্গতি পাওয়া গেছে।
১৭ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে নয় সেকেন্ডের পর আগের দৃশ্য আবার দেখানো হয়েছে। ক্যামেরার কোণ একই থাকলেও দ্বিতীয় অংশে পুলিশের পেছনে একজন ব্যক্তিকে দেখা যায়, যিনি প্রথম অংশে সেখানে ছিলেন না।
ভিডিওর শুরুতে একজন পুলিশ সদস্যকে ব্রিফকেসসদৃশ একটি বস্তু থেকে দুটি পিস্তল বের করে মাটিতে রাখতে দেখা যায়।
পাঁচ সেকেন্ডের মাথায় ওই পুলিশ সদস্য মাটিতে হাত দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে হঠাৎ আরেকটি পিস্তল দেখা যায়। এর আগে সেখানে ওই পিস্তলটি ছিল না। পুলিশ সদস্য সেটি হাতে নিয়ে ব্রিফকেসে রাখার সময় পিস্তলটি অদৃশ্য হয়ে যায়।
সাত সেকেন্ডে আরেক পুলিশ সদস্যকে বসে থাকা পুলিশ সদস্যের পাশে একটি পিস্তল রাখতে দেখা যায়। কিন্তু মাটিতে রাখার সঙ্গে সঙ্গেই পিস্তলটি অদৃশ্য হয়ে যায়।
ভিডিওর ১১ থেকে ১৩ সেকেন্ডের মধ্যে পুলিশের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তির হাতে হঠাৎ পলিথিনের বস্তাসদৃশ একটি বস্তু দেখা যায়। অথচ এর এক সেকেন্ড আগেও তাকে হাত উঁচিয়ে কিছু বলতে দেখা যায় এবং তখন তার হাতে কিছু ছিল না।
পলিথিনের বস্তাটি হাতে দেখা দেওয়ার পর মুহূর্তের মধ্যেই ওই ব্যক্তিকেও দৃশ্য থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতে দেখা যায়।
ভিডিওটির বিভিন্ন দৃশ্যে মানুষ ও বস্তুর এমন হঠাৎ আবির্ভাব, পরিবর্তন এবং অদৃশ্য হয়ে যাওয়া এআই দিয়ে তৈরি ভিডিওর সাধারণ অসঙ্গতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আরও নিশ্চিত হতে ভিডিওটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশনের মাধ্যমে পরীক্ষা করেছে দ্য ডিসেন্ট। পরীক্ষার ফলাফলে ভিডিও এবং এতে ব্যবহৃত ভয়েসওভার, দুটিই এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি বলে শনাক্ত হয়েছে।

বাংলাদেশ নিয়ে অপতথ্যের উৎস সালাহ উদ্দিন শোয়েব
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশবিষয়ক অপতথ্যের অন্যতম উৎস হয়ে উঠেছেন সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী।
তার ছড়ানো ভুয়া তথ্যের মাধ্যমে কয়েকটি নির্দিষ্ট বয়ান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে, ‘বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর গণহত্যা চলছে’, ‘বাংলাদেশ ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের দখলে চলে গেছে’ এবং ‘বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতি রয়েছে’। দ্য ডিসেন্টসহ বিভিন্ন ফ্যাক্ট-চেকিং সংস্থা তার প্রচার করা একাধিক ভুয়া দাবি খণ্ডন করেছে।দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে।