Image description

অনলাইনে সরকারবিরোধী কৌতুক বা ব্যঙ্গ হিসেবে যাত্রা শুরু করা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এখন ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তরুণ-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। যাদের মোকাবিলা করতে গিয়ে রীতিমত হিমশিম খেতে হচ্ছে নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্র সরকারকে।

১২ বছরের বেশি সময় ধরে ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) ব্যঙ্গ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে অ্যাকাউন্ট ও পেজ খোলা হয়, যা রাতারাতি সরকারবিরোধী আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোয় পরিবর্তন আনা এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় সরকারি উদাসীনতার জেরে যে ক্ষতি হয়েছে, তা পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে এক মাসের বেশি সময় ধরে এই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন দেশটির তরুণ ছাত্রজনতা।

‘আমরাই তেলাপোকা’ যে আন্দোলনের ভিত্তি

সামাজিকমাধ্যমে ‘উই আর ককরোচেস’ নামে হ্যাশট্যাগ দিয়ে আন্দোলনকারীরা নিজেদের ‘ককরোচ’ বা তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করছেন। তরুণ শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলন এরইমধ্যে বিশ্বে ভারতের জেন-জি আন্দোলন হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক বছরগুলোর অন্যতম দৃশ্যমান গণচ্যালেঞ্জ তৈরি করেছেন।

ছবি: ককরোচ জনতা পার্টির ইন্সটাগ্রাম থেকে নেওয়া

এই আন্দোলনের প্রাথমিক কারণ ছিল ভারতের অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষা এবং সরকারি চাকরির কয়েকটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ। এসব পরীক্ষা লাখ লাখ ভারতীয়ের জন্য স্থায়ী চাকরি এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পথ।

পরীক্ষার প্রশ্ন আগেই ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে কর্তৃপক্ষকে প্রায়ই পরীক্ষা বাতিল অথবা পুনরায় আয়োজন করতে হয়। এতে মাসের পর মাস কিংবা বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেওয়া শিক্ষার্থীরা সময় হারান এবং দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান।

ককরোচ পার্টির আত্মপ্রকাশ

মূলত শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে এই আন্দোলনের সূচনা হয় গত মে মাসে। প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কহীন একটি মামলার শুনানির সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত দেশটির কিছু বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ ও পরজীবীর সঙ্গে তুলনা করেন।

তার এই মন্তব্য ঘিরে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে অনলাইনে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ভারতের বহু তরুণ প্রধান বিচারপতির ওই মন্তব্যকে নিজেদের পরিচয়ের অংশ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং তেলাপোকাকে টিকে থাকার প্রতীক হিসেবে বেছে নেন।

ককরোচ জনতা পার্টির প্ল্যাটফর্ম। ছবি: এপি/ইউএনবি

এর জেরে ব্যঙ্গ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা ‘তেলাপোকা জনতা পার্টি’ গঠনের ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দিপকে। কয়েক দিনের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার এই প্রচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) অনুসারীর সংখ্যা দুই কোটি ১০ লাখ ছাড়িয়ে যায়।

সংগঠনের সমর্থকেরা বেকারত্ব, সীমিত চাকরির সুযোগ এবং অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে মোদি সরকারকে লক্ষ্য করে ব্যঙ্গচিত্র, রসাত্মক নির্বাচনী স্লোগান ও রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য প্রকাশ করতে থাকেন। অনুসারীদের পাশে অবস্থান করতে গত জুন মাসে অভিজিৎ দিপকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরে আসেন। এরপর তার নেতৃত্বে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনটি রাজপথে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। তিনি হাজার হাজার তরুণ ও ছাত্রজনতাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বিভিন্ন শহর ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন।

যন্তর মন্তরের বিক্ষোভ মঞ্চে জনতার ঢল

তবে আন্দোলনের কেন্দ্র হয়ে ওঠে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির অন্যতম পরিচিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তর। শিক্ষার্থীদের দাবি না মানা পর্যন্ত এখানেই সিপেজির অনির্দিষ্টকাল অনশন ও অবস্থান কর্মসূচির পরিকল্পনা সরকারের ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করে। পাশাপাশি বিরোধীদলের নেতা, অভিনয় শিল্পী, ক্রিকেটার, গায়কসহ দেশটির বিভিন্ন অঙ্গনের পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ শিক্ষার্থীদের সমর্থন দিতে শুরু করলে তা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়।

এর পর থেকে আন্দোলনকারীরা যন্তর মন্তরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা কিংবা ক্ষোভ থেকে প্রাণ হারানো শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন।

দিল্লিতে বিক্ষুব্ধ জনতার ঢল। ছবি: এপি/ইউএনবি

নয়াদিল্লির অবস্থান কর্মসূচিতে প্রথম দিকে প্রতিদিন কয়েকশ মানুষ অংশ নিলেও অল্প সময়ের মধ্যেই অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কয়েক হাজারে পৌঁছে যায়।

শুরুতে সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার দাবি প্রত্যাখ্যান করে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দেশের স্বার্থের বিপক্ষে কাজ করার অভিযোগ তোলেন। তিনি আরও দাবি করেন, নতুন করে পরীক্ষা আয়োজনের নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে সরকার সংকটের সমাধান করেছে।

আন্দোলনের মূল ভূমিকায় সোনম ওয়াংচুকের অনশন

এই আন্দোলন নতুন করে প্রাণ পায় ভারতের লাদাখের বিশিষ্ট আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সমর্থন পাওয়ার পর। তিনি সিজেপি এবং বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দিয়ে অনির্দিষ্টকাল অনশন শুরু করলে সরকারের নিশ্চুপ ভূমিকা নিয়ে কঠোর সমালোচনা শুরু হয়।

যন্তর মন্তরে অনশনে সোনম ওয়াংচুক। ছবি: এপি/ইউএনবি

প্রায় ২১ দিন অনশনের পর সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে আদালতের নির্দেশে তাকে বিক্ষোভ মঞ্চ থেকে তুলে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে দিল্লি পুলিশ। ককরোচ জনতা পার্টির অভিযোগ, ওয়াংচুককে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে তুলে নেওয়া হয়েছে।

মোদি সরকারের কঠোরতাই আন্দোলন দমনের ব্যর্থতা?

এরপর তারা দেশটির পার্লামেন্ট অভিমুখে ‘সংসদ চলো’ পদযাত্রা ও মিছিলের কর্মসূচি দিলে পুলিশের বাধা, লাঠিচার্জ, টিয়ার শেল ও জলকামান ছোড়ায় তা পণ্ড হয়ে যায়। রাতভর দেশজুড়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে চলে ধরপাকড়। সিজেপির দাবি, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়েছেন। ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের হতাহতের ঘটনা এড়াতে তারা নতুন করে কোনো পদযাত্রা না করার ঘোষণা দেন।

পুলিশের এই দমনমূলক পদক্ষেপের পর জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হলে মোদি সরকারের একজন মন্ত্রী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এটিই ছিল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সরকারের প্রথম প্রকাশ্য যোগাযোগ। তবে ওই আলোচনা উত্তেজনা কমাতে পারেনি।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিরোধীদলের নেতা রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সমর্থন। ছবি: এপি/ইউএনবি

মঙ্গলবার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী মোদির বাসভবনের বাইরে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার পর সরকারের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়। এর মাধ্যমে ‘ককরোচ’ আন্দোলন ভারতের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, চলমান সংসদ অধিবেশনে সরকার তরুণদের প্রতিটি যৌক্তিক উদ্বেগের সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে তিনি পদত্যাগ করবেন কি না, সে বিষয়ে কিছু বলেননি। তার পদত্যাগ এখনো আন্দোলনকারীদের অন্যতম প্রধান দাবি।

প্রধানমন্ত্রী মোদির আশ্বাস

এতো জল ঘোলার পরও পরিস্থিতি অনুকূলে না আসায় শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে অবশেষে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে প্রকাশ্যে নমনীয় ভঙ্গিতে সামাজিকমাধ্যম এক্সে বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে বিক্ষুব্ধদের আশ্বস্ত করেন তিনি।

নিট প্রশ্ন ফাঁসে কঠোর পদক্ষেপের আশ্বাস দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি
নিট প্রশ্ন ফাঁসে কঠোর ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়ে ভিডিও বার্তা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ছবি: স্ক্রিনগ্র্যাব

শিক্ষার্থীদের দাবি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করার পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারের আশ্বাস ও কেন্দ্র সরকারের অনুরোধের শুক্রবার অনশন ভাঙেন সোনম ওয়াংচুক।

ভারতের রাজনীতিতে ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ প্রভাব

বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্দোলনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এটি সরকারের জবাবদিহি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বৃহত্তর হতাশার প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। বহু বিক্ষোভকারী বলেছেন, শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিচার বিভাগ এবং সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আস্থা নষ্ট হয়ে গেছে।

প্রচলিত রাজনৈতিক দলের মতো কোনো নির্দিষ্ট কাঠামো না থাকাও আন্দোলনটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। আয়োজক সিপেজির মতে, স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকেরা নিজেদের খরচে বিক্ষোভে যাতায়াত করছেন এবং জনসমাগমের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নির্ভর করছেন।

তবে শিক্ষার্থী এবং তরুণদের বাইরে সাধারণ জনগণের মধ্যে আন্দোলনটির দ্রুত বিস্তার ভারতের শিক্ষিত যুব সমাজের মধ্যে বাড়তে থাকা হতাশার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তরুণদের ক্রমবর্ধমান হতাশা ভবিষ্যৎ নির্বাচনের আগে ভারতের রাজনীতিতে আরও বিস্তৃত প্রভাব ফেলতে পারে। অনেকে এই আন্দোলনকে দক্ষিণ এশিয়ার ধারাবাহিক সরকারবিরোধী আন্দোলনে তরুণ নেতৃত্বের প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করেছেন।