ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত একটি চুক্তিকে ভেস্তে দিতে ও মার্কিন জনমতকে সেই চুক্তির বিপক্ষে প্রভাবিত করতে ইসরায়েল সরকারের কিছু সদস্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ওয়াশিংটনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তার এমন সরাসরি ও তীব্র সমালোচনা আন্তর্জাতিক মহলে নজিরবিহীন শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
বুধবার (১৫ জুলাই) মার্কিন পডকাস্টার জো রোগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স এই বিস্ফোরক দাবি করেন।
গত মাসে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হওয়া যুদ্ধ বিরতি চুক্তির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়ে তিনি বলেন, আমি কোনো রকম সন্দেহের ঊর্ধ্বে উঠে নিশ্চিতভাবে জানি যে- ইসরায়েল সরকারের ভেতরে এমন কিছু মানুষ আছেন, যারা আমাদের এই নীতি (চুক্তি) থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। কারণ, তারা এই সামরিক অভিযান চালিয়ে যেতে চান।
বিদেশি প্রভাব খাটানোর ডিজিটাল ক্যাম্পেইন
ভবিষ্যতের সম্ভাব্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে বিবেচিত ভ্যান্স এর আগেও একাধিকবার ইসরায়েলের সমালোচনা করেছেন। দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা প্রকাশ্য দূরত্বের মধ্যেই তার এই নতুন বক্তব্য সামনে এলো।
রোগানের পডকাস্টে তিনি বলেন, আমি যে চুক্তির পেছনে ছুটছিলাম, সেটিকে ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্য আক্ষরিক অর্থেই একটি বিদেশি প্রভাব খাটানোর ক্যাম্পেইনে অর্থায়ন করা হচ্ছে।
এই দাবির পক্ষে সোমবার (১৩ জুলাই) টাইম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ইসরায়েলের পক্ষে মার্কিন নাগরিকদের চিন্তাভাবনা ও ইরান যুদ্ধ সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে একটি ডিজিটাল ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য ট্রাম্পের সাবেক এক নির্বাচনী প্রচারণাকারীকে নিয়োগ করা হয়েছিল।
ভ্যান্স বলেন, আলোচনা ও চুক্তিকে লাইনচ্যুত করতে অত্যন্ত বিচক্ষণ ও বিপুল অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রচার অভিযান আপনারা দেখছেন। তাদের ব্যবস্থার মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা যুদ্ধকে অনির্দিষ্টকালের জন্য টিকিয়ে রাখতে মার্কিন জনমতকে ম্যানিপুলেট ও পরিবর্তন করার চেষ্টা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি থেকে আল-জাজিরার সংবাদদাতা প্যাটি কুলহানে জানান, ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট এই প্রভাব খাটানোর প্রচারণার মূল লক্ষ্য সম্ভবত ট্রাম্পের ‘মাগা’ (Make America Great Again) সমর্থক গোষ্ঠী, যারা বর্তমানে ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন নীতি নিয়ে নিজেদের মধ্যে বিভক্ত।
কুলহানে ব্যাখ্যা করেন, ভ্যান্স কেন জো রোগানের পডকাস্টে গিয়েছেন, তা এখান থেকেই স্পষ্ট হয়। রোগান দেশটির অন্যতম জনপ্রিয় পডকাস্টার ও তিনি মাগা ঘাঁটির তরুণদের চিন্তাভাবনা প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্যক্তিত্ব।
ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হয়েছেন ভ্যান্স
সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট আরও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানোর কারণে এই ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পেইনটি তাকে ব্যক্তিগতভাবেও নিশানা করেছে। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট দেশের জন্য যে আলোচনার লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা আক্ষরিক অর্থে পূরণ করার চেষ্টা করার অপরাধে মানুষ আমাকে নির্মমভাবে আক্রমণ করছে।
অবশ্য ভ্যান্স স্বীকার করেছেন যে মিত্র ও শত্রু নির্বিশেষে সবাই মার্কিন নীতিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে ও এটি নিয়ে তার কোনো আপত্তি নেই। তবে তিনি সাফ জানিয়ে দেন, ইসরায়েল যখন এটি করার চেষ্টা করে তখন আমি কিছু মনে করি না। তবে যা আমাকে সত্যিই বিরক্ত করে তা হলো- যখন এই অপারেশন বা প্রভাব খাটানোর ক্যাম্পেইনগুলো আসলে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও বিচারবুদ্ধিকে প্রভাবিত করে।
গত মাসে ইরানের সঙ্গে যে অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি হয়েছিল, ইসরায়েলে সেটির তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও ভ্যান্স তার পক্ষে নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে গত এক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমাগত পাল্টাপাল্টি হামলার কারণে এই চুক্তিটি অনেকটাই ভেস্তে গেছে বলে মনে হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল- ইসরায়েলি প্রভাব না থাকলে কি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে এই সাম্প্রতিক যুদ্ধে জড়াতো? জবাবে ভ্যান্স বলেন, হ্যাঁ, আমি তা-ই মনে করি। তিনি যোগ করেন, আমি মনে করি ইসরায়েলের যে কোনো প্রভাবের বাইরে গিয়েও প্রেসিডেন্ট দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন ও আমি এর সঙ্গে একমত যে, ইরানের কোনো পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়।
এর আগে গত জুনেও ইরান চুক্তির ইসরায়েলি সমালোচকদের কঠোর ভাষায় ধমক দিয়েছিলেন ভ্যান্স। সে সময় ইসরায়েলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের শত শত কোটি ডলারের সামরিক সহায়তার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছিলেন যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই ইসরায়েলের একমাত্র প্রকৃত বন্ধু।
মার্কিন ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা
সাবেক ইসরায়েলি কূটনীতিক অ্যালন পিঙ্কাস ভ্যান্সের এই সর্বশেষ মন্তব্যকে ‘নজিরবিহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার মতে, এর মাধ্যমে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল বর্তমানে একই অবস্থানে নেই।
বর্তমানে ‘দ্য নিউ রিপাবলিক’-এর কলামিস্ট পিঙ্কাস আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ক্ষমতাসীন ভাইস প্রেসিডেন্ট এর আগে কখনো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মার্কিন নীতিকে ক্ষুণ্ণ করার জন্য প্রকাশ্যে প্রচারণা চালানোর অভিযোগ তোলেননি। অতীতে মতবিরোধ বা মৃদু দ্বন্দ্ব ছিল, তবে একজন দায়িত্বরত ভাইস প্রেসিডেন্ট এভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলি প্রভাব খাটানোর প্রচারণার বিরুদ্ধে এত জোরালো, স্পষ্ট ও রূঢ়ভাবে কথা বলবেন, তা সত্যিই নজিরবিহীন ও বেশ চমকপ্রদ।
আল জাজিরার সাংবাদিক কুলহানেও ভ্যান্সের এই মন্তব্যকে ‘অশ্রুতপূর্ব’ অর্থাৎ আগে কখনো শোনা যায়নি এমন বলে বর্ণনা করেছেন।
এছাড়া এই সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স প্রয়াত দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনকে ঘিরে থাকা বিতর্কের বিষয়ে কথা বলেন। তিনি উল্লেখ করেন যে মার্কিন ও ইসরায়েলি উভয় দেশের গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপর্যায়েই এপস্টেইনের সুনির্দিষ্ট কিছু সংযোগ ছিল।
জেডি ভ্যান্সের এমন সব বিস্ফোরক মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য বা প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।