Image description

উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে অনার্স শেষ করে ইউরোপের দেশ জার্মানিতে পাড়ি জমানোর প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন ছিল। আইইএলটিএসসহ প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতিও শেষ। কিন্তু ঠিক সেই সময় জীবনের মোড়ে আসে এক বড় পরিবর্তন। বাবা-মা দুজনই চাকরিজীবী হওয়ায় পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ ও টান তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। বিদেশে স্থায়ীভাবে ক্যারিয়ার গড়ার পরিকল্পনা বাদ দিয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেন দেশের মাটিতেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়বেন। জার্মানির স্বপ্নকে একপাশে সরিয়ে রেখে শুরু করেন বিসিএসের প্রস্তুতি। সেই সিদ্ধান্তই আজ তাকে এনে দিয়েছে ৪৭তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশ। 

বলছিলাম যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং (পিএমই) বিভাগের স্নাতক তওসিফ আলি সিফাতের কথা। তার ক্যাডার হওয়ার গল্পটি শুধুই সাফল্যের নয়; এটি ত্যাগ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, ধারাবাহিক পরিশ্রম এবং এক ব্যতিক্রমী জীবনের গল্প।

সিফাতের শৈশব কেটেছে বাগেরহাট ও খুলনার গ্রাম এবং শহরের দুই ভিন্ন পরিবেশে। একদিকে ছিল কাদামাটি মেখে মাছ ধরার স্বাধীন গ্রামীণ জীবন, অন্যদিকে শহরের নিয়মতান্ত্রিক ও পরিপাটি পরিবেশ। এই দুই ভিন্ন বাস্তবতার অভিজ্ঞতা তাকে যেকোনো পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মানসিক শক্তি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

লেখাপড়ায় বরাবরই মেধাবী ছিলেন তিনি। পিএসসি ও জেএসসিতে বৃত্তি লাভের পর ২০১৬ সালে খুলনার খালিশপুর রোটারি স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং ২০১৮ সালে সরকারি বি.এল. কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। তবে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রত্যাশামতো না হওয়ায় সেই অভিজ্ঞতা তাকে আরও পরিণত করে তোলে। 

সিফাতের বাবা এবং আত্মীয়স্বজনদের অনেকেই সরকারি চাকরিজীবী। ফলে ছোটবেলা থেকেই সিভিল সার্ভিসের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএসসি সম্পন্ন করার পর তার মূল লক্ষ্য ছিল জার্মানিতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ। আইইএলটিএসসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও শেষ করেছিলেন। কিন্তু পারিবারিক কিছু বাস্তবতার কারণে শেষ মুহূর্তে বিদেশে স্থায়ীভাবে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এরপরই দেশের মাটিতে থেকে সিভিল সার্ভিসে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা দৃঢ় হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি লিপ ইয়ারের সেই বিশেষ দিনটিকেই জীবনের নতুন শুরুর দিন হিসেবে বেছে নেন তিনি। সেদিন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিএসের প্রস্তুতি শুরু করেন। দীর্ঘ সময় পড়ার টেবিলে বসার অভ্যাস গড়ে তুলতে শুরুতেই কোনো পাঠ্যবই নয়, হাতে তুলে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস চোখের বালি। সেই অভ্যাসের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল ৪৭তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার শেষ দিন পর্যন্ত। 

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সিফাত ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত, সামাজিক এবং আড্ডাপ্রিয়। কিন্তু বিসিএস প্রস্তুতির সময় নিজেকে পুরোপুরি বদলে ফেলেন। পুরো প্রস্তুতিকালে তিনি স্মার্টফোন ব্যবহার করেননি। ফেসবুক অ্যাকাউন্টও ডিঅ্যাক্টিভেট করে রাখেন। পড়াশোনার জন্য একমাত্র ভরসা ছিল তার ল্যাপটপ।

তার প্রস্তুতির মূলমন্ত্র ছিল ধারাবাহিকতা। একটি অনলাইন কোচিংয়ের দৈনিক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে প্রতিদিন নির্ধারিত অংশ শেষ করার পাশাপাশি নিজের অবস্থান মূল্যায়ন করতেন। প্রিলিমিনারির প্রস্তুতির পাশাপাশি সাধারণ জ্ঞান ও বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়াতে নিয়মিত পত্রিকা পড়তেন, টেলিভিশনের টকশো দেখতেন এবং ইতিহাস ও সমসাময়িক বিষয় নিয়ে গুণীজনদের বিভিন্ন বক্তৃতা শুনতেন।

সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বিষয় হলো, স্কুলজীবনে তিনি কখনো রচনা, ভাবসম্প্রসারণ, প্যারাগ্রাফ কিংবা চিঠি মুখস্থ করেননি। সবসময় নিজের ভাষায় লিখতে অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি বলেন, এই মৌলিক লেখার অভ্যাসই ৪৭তম বিসিএসের নতুন ধাঁচের বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নের উত্তর দিতে তাকে বিশেষভাবে সহায়তা করেছে।

ক্যাডার পছন্দের তালিকায় সিফাতের শীর্ষে ছিল পররাষ্ট্র, প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডার। আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে আগ্রহ থাকায় পররাষ্ট্র ক্যাডারই ছিল তার প্রথম পছন্দ। নতুন চাকরিপ্রার্থীদের উদ্দেশে সিফাত বলেন, ‘ক্যাডার চয়েজের ক্ষেত্রে প্রতিটি ক্যাডারের কাজের ধরন জানা জরুরি। কোনোটির নির্দিষ্ট অফিস আওয়ার নেই, কোনটি আবার দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি। নিজের চাওয়া ও ক্যাডারের সুবিধা-অসুবিধা বুঝে তবেই চয়েজ লিস্ট সাজানো উচিত।’ 

ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব নিয়েও তিনি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের যেকোনো চাকরির পরীক্ষায় ইংরেজি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে লিখিত ও ভাইভায় ইংরেজিতে দক্ষতা থাকলে অনেকখানি এগিয়ে থাকা যায়। আর দুই বছর নিয়ম মেনে ধারাবাহিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারলে যেকোনো চাকরির পরীক্ষায় আশানুরূপ ফল করা সম্ভব। বিসিএসের প্রস্তুতি নিলে আইবিএ বাদে নবম গ্রেডের প্রায় সব চাকরির প্রস্তুতিই হয়ে যায়।’