Image description

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে বাড়ছে দখলদার ইসরায়েলিদের আধিপত্য। গাজা যুদ্ধের জেরে প্রায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের জমি, ঘরবাড়ি ও কষ্টে উপার্জিত সম্পদে জোরপূর্বক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে চলেছেন তারা। পাহাড় ঘেঁষা মনোরম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে তিলে তিলে গড়ে তোলা ফিলিস্তিনি সভ্যতাও ইসরায়েলি আগ্রাসনে হারাতে বসেছে।

পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা এবং পূর্ব জেরুজালেমসহ আশপাশের এলাকার হাজার বছরের ইতিহাসে গড়ে ওঠা মানুষের জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, সমাজব্যবস্থা, ঐতিহ্য ও পরিচয় আজ হুমকির মুখে।

অব্যাহত ইসরায়েলি হামলা ও পশ্চিম তীরে দখলদার ইসরায়েলিদের আধিপত্যে ‘ড্রিম হোম’ বা স্বপ্নের বাড়ি হারিয়ে বাস্তুচ্যুত জীবন যাপনে বাধ্য হয়েছেন অগণিত ফিলিস্তিনি। রয়টার্সের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এমন তথ্য।

ফিলিস্তিনি নাগরিক মোহাম্মদ সালামেহ জানান, যুদ্ধ শুরুর আগে তিনি পরিবারের জন্য পশ্চিম তীরে একটি আধুনিক সুবিধাসম্পন্ন বাড়ি তৈরি করছিলেন। কথা ছিল, তার সদ্য বাগদান করা ছেলে ও তার সঙ্গী বিয়ের পর এই বাড়িটি উপহার হিসেবে পাবে। সে বাড়িতেই নববিবাহিত দম্পতি নিজেদের পারিবারিক জীবন শুরু করবেন।

অথচ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাদের বিবাহিত জীবনের সূচনা হয়েছে বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় শিবিরে। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার আগেই পশ্চিম তীরে বসতি গড়ে তোলা দখলদার ইসরায়েলিদের একটি দল ওই বাড়ি ও লাগোয়া সম্পদ দখল করে নেয়।

পশিম তীরে বাড়ছে ইসরায়েলি দখলদারদের সংখ্যা। ছবি: এপি/ইউএনবি

এক ভিডিওতে দেখা যায়, পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নির্মাণাধীন দুইতলা বাড়িটির ছাদে ঘোরাফেরা করছেন অন্তত ছয়জন ইসরায়েলি।

 

সালামেহ জানান, তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশের কাছে সহায়তা চেয়েছিলেন, কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তার আশঙ্কা, এই বাড়িটিও পশ্চিম তীরের অন্য অনেক বাড়ির মতো ইসরায়েলি বসতি ও সেনাদের ছোট আউটপোস্টে রূপান্তর হয়ে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে।

সালামেহের মতে, ওই এলাকার অন্য অভিজাত পরিবারের বাড়িগুলোর ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।

তিনি বলেন, ‘আল্লাহই জানেন, যদি আইন ও শাসন থাকে তাহলে তারা চলে যাবে। কিন্তু যদি তারা একটি বাড়ি দখল করতে পারে, তাহলে বাকি সবাইও একই পরিণতির মুখে পড়বে।’

দীর্ঘ হচ্ছে পশ্চিম তীরের দখল নিয়ে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধ। ছবি: এপি/ইউএনবি

সালামেহর জন্য ইসরায়েলিদের সঙ্গে এই বিরোধ অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও বেদনাদায়ক। ২০২৩ সালে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বাড়িটির নির্মাণ কাজ থেমে যায় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ চলছে, ছেলে কোনো কাজ খুঁজে পায়নি। আর্থিক সংকট ও  জীবন নিয়ে ছুটে পালানোর পরিবেশে বাড়ি নির্মাণ বিলাসী শখ।’

 

‘প্রতিবেশীর খুব কাছেই একটি দুইতলা বাড়ি তৈরি হয়েছে, সেটিও তারা হয়তো নিয়ে নেবে। যদি আমাদের এই বাড়িটি হারাই, তাহলে তাদেরটিও হারাবে’, যোগ করেন তিনি।

অবশ্য রয়টার্স ওই বাড়িটির বর্তমান দখলদারদের কোনো মন্তব্য নিতে পারেনি।

এ বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংবাদ মাধ্যমটি যোগাযোগ করলে তারা তদন্তের আশ্বাস দেয়। তবে শুক্রবার পর্যন্ত তারা কোনো স্পষ্ট জবাব দেয়নি। ইসরায়েলি পুলিশও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

দখলদারি ও হামলা বেড়েছে নেতানিয়াহু সরকারের সময়

পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি ভূমি দখল করে বসতকারীদের স্থাপনা গড়ে তোলা দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। পশ্চিম তীর ফিলিস্তিনি ভূমি হিসেবে দাবি করা হলেও সেখানে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ ইসরায়েলি নাগরিক বসবাস করে।

ফিলিস্তিনিরা বহু বছর ধরে অভিযোগ করে আসছেন, বসতি সম্প্রসারণের সঙ্গে জড়িত সহিংসতার মধ্যে তাদের কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ভাঙচুর এবং হামলার ঘটনাও রয়েছে।

জাতিসংঘের একটি তদন্তে বলা হয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি গ্রাম ও কৃষিজমিতে ইসরায়েলি দখলদারদের হামলা ১৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সালামেহর গ্রাম জালুদের বাসিন্দারা জানান, এই সপ্তাহের ঘটনাটি আরও উদ্বেগজনক, কারণ বসতকারীরা এমন একটি বাড়ি দখল করেছে যা তখনো নির্মাণাধীন ছিল। গ্রাম পরিষদের প্রধান রায়েদ আল হাজ মোহাম্মদ বলেন, ‘তারা এখন জালুদের শেষ বাড়ি থেকে একশ মিটারেরও কম দূরত্বে চলে এসেছে। সেটিও একটি নির্মাণাধীন বাড়ি, একজন স্থানীয় বাসিন্দার। অর্থাৎ তারা গ্রামে ঢুকতে চাইছে।’

তিনি আরও জানান, জালুদে এখন পর্যন্ত পাঁচটি বড় ধরনের হামলা হয়েছে, যার মধ্যে বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং গাছ উপড়ে ফেলার ঘটনা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয় দেখাতেই দখলদার ইসরায়েলিরা একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের উস্কে দিচ্ছেন ইসরায়েলি সেনা ও পুলিশ।

ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মানচিত্র। ছবি: এপি/ইউএনবি

মধ্যপ্রাচ্যের বেশিরভাগ দেশ এবং জাতিসংঘ পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ বলে মনে করে। ফিলিস্তিনিরাও পশ্চিম তীর, গাজা এবং পূর্ব জেরুজালেমকে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখে। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, দখলকৃত এলাকায় কোনো বেসামরিক জনগোষ্ঠী স্থানান্তর করা নিষিদ্ধ। অর্থাৎ, পশ্চিম তীরের যে অংশ ইসরায়েলের দখলে রয়েছে সেখানেও ইসরায়েলি নাগরিকদের আবাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

তবে ইসরায়েল এই অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে বলে থাকে, পশ্চিম তীর একটি বিতর্কিত এলাকা, যেখানে হাজার বছর ধরেই ইহুদি উপস্থিতি রয়েছে।

অবৈধ বসতি নির্মাণ ও দখলদারদের সহিংসতা দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রচেষ্টার অন্যতম বড় বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এমনকি ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রও এসব কর্মকাণ্ডের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছে।

তবুও, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের অধীনে পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ আরও দ্রুত ঘটেছে, কারণ তার সরকার সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে মূলত কট্টরপন্থি ও পশ্চিম তীর দখলের সমর্থকদের ওপর নির্ভরশীল।