মাঠে এগারো জন বনাম এগারো জনের লড়াই; ফুটবলকে তো আমরা এভাবেই চিনে এসেছি। কিন্তু ২০২৬ সালের জুনে এসে বিশ্ব দেখল এক নির্মম সত্য।
বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার চরম দ্বিমুখী নীতি আর মার্কিন প্রশাসনের দাম্ভিক নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে পিষ্ট হয়ে গেল একটা দেশের কোটি মানুষের আবেগ, কয়েকজন তরুণের রক্ত-ঘামের স্বপ্ন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে যখন নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ গোলে বুক চিতিয়ে লড়ে ম্যাচ ড্র করল ইরান, তখন তাদের ড্রেসিংরুমে হাজির হয়েছিলেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। স্বভাবসুলভ চওড়া হাসিতে পিঠ চাপড়ে বললেন,
এমনকি প্রধান কোচ আমির গালেনোইয়ের কাঁধে হাত দিয়ে রসিকতা করলেন,
ইনফান্তিনো যখন ড্রেসিংরুমে হাসির রোল তুলছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে ইরানের লেফট উইঙ্গার মেহেদি তোরাবি এক বুক শঙ্কা নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন একটি নতুন ভিসার জন্য, কারণ তাকে মাত্র ‘সিঙ্গেল এন্ট্রি’র অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। দলের সবচেয়ে বড় তারকা ও অধিনায়ক মেহেদি তারেমিকে লস অ্যাঞ্জেলেস বিমানবন্দরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের নামে মানসিক হেনস্তা করা হয়েছিল।
অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার শর্ত হিসেবে ফিফার কাছে আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকো লিখিত অঙ্গীকার করেছিল বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দল, খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের ভিসা প্রক্রিয়া হবে দ্রুত ও নির্বিঘ্ন। কিন্তু ওয়াশিংটন যখন সেই চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য ‘ছেলেখেলা’ খেলল, তখন বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক ফিফাকে দেখাল স্রেফ মেরুদণ্ডহীন এক নীরব দর্শক।
নিজেদের মাটিতে শান্তি আর স্বস্তিতে অনুশীলন করার অধিকারটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল ইরানি ফুটবলারদের কাছ থেকে। ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক হামলার পর তৈরি হওয়া রাজনৈতিক অস্থিরতাকে অস্ত্র বানাল ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ঔদ্ধত্যের সঙ্গে মন্তব্য করলেন, তারা এই সুযোগে কাউকে যুক্তরাষ্ট্রে ‘সন্ত্রাসী’ পাচার করতে দেবেন না!
ফলাফল? ইরানের ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহেদি তাজ, সাধারণ সম্পাদক হেদায়াত মোম্বেইনিসহ ডজনখানেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার ভিসা বাতিল করা হলো। বাদ দেওয়া হলো দলের অ্যানালিস্ট ও টেকনিক্যাল স্টাফদের। দলটিকে বাধ্য করা হলো তাদের অ্যারিজোনার ট্রেনিং ক্যাম্প বাতিল করে মেক্সিকোর সীমান্ত শহর তিজুয়ানায় বেস ক্যাম্প করতে।
সেখানকার নিয়ম ছিল আরও অমানবিক। ম্যাচের মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে বা খেলার দিন গভীর রাতে তাদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হতো, আর খেলা শেষ হওয়া মাত্রই তাড়াহুড়ো করে তাড়িয়ে দেওয়া হতো মার্কিন সীমানা থেকে। ১২ ঘণ্টার সময়ের পার্থক্যের সঙ্গে মানিয়ে নিতে যেখানে অন্তত দুই সপ্তাহ আগে ভেন্যুতে পৌঁছানো উচিত, সেখানে ম্যাচের আগের দিন পৌঁছানো কি কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার স্বাভাবিক পরিবেশ?
অধিনায়ক এহসান হাজসাফি ক্ষোভ উগরে দিয়ে ফিফার কাছে প্রশ্ন তুলেছিলেন,
সাপোর্ট স্টাফ নেই, রিকভারির সুযোগ নেই; ডানা ভেঙে দিয়ে ইরানকে বলা হলো আকাশে উড়তে!
— মেহেদি তারেমি, মিশর ম্যাচের পর অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন।
সব বৈরিতা, গ্যালারির একদলের দুয়োধ্বনি আর গায়ের ওপর চেপে বসা ভূ-রাজনীতির পাহাড় সামলেও মাঠে কিন্তু পা হড়কায়নি ইরানের সিংহদের। বেলজিয়ামের মতো পরাশক্তির সঙ্গে গোলশূন্য ড্র, আর শেষ ম্যাচে সিয়াটলে মিশরের বিপক্ষে ১-১ গোলের মহাকাব্যিক লড়াইয়ে ইরান তার সামর্থ্যের শেষ বিন্দু দিয়ে লড়েছিল।
২৮ জুনের সেই রাতটি ইরানি ফুটবলের ইতিহাসে দীর্ঘশ্বাসের সমার্থক হয়ে থাকবে। তিজুয়ানার ম্যারিয়ট হোটেলের রুমে টিভি পর্দার সামনে গোল হয়ে বসেছিলেন তারেমি-রেজাইয়েনরা। আলজেরিয়া বনাম অস্ট্রিয়া ম্যাচ। ৯৩ মিনিটে যখন আলজেরিয়ার রিয়াদ মাহরেজ গোল করলেন, হোটেলের সেই ছোট্ট কামরাটা ইরানি খেলোয়াড়দের বাঁধভাঙা উল্লাসে কেঁপে উঠেছিল। ওই এক গোলে নকআউটের দরজা খুলছিল তাদের।
কিন্তু ভাগ্য যার সহায় থাকে না, তার জন্য নিয়তি আরও নিষ্ঠুর হয়। মাত্র তিন মিনিট পর, ৯৬ মিনিটে অস্ট্রিয়ার সমতাসূচক গোল মুহূর্তে স্তব্ধ করে দিল পুরো ঘর। কান্নায় ভেঙে পড়লেন তরুণ ইরানি ফুটবলাররা। হোটেলের মেঝেতে বসে মাথা নিচু করে থাকা সেই ফুটবলারদের ছবি দেখে কোনো ফুটবলপ্রেমীর বুক কাঁপেনি?
আমেরিকা ইরানকে বিদায় করে দিয়ে উল্লাস করেছে। মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটির প্রধান মার্কওয়েন মুলিন যখন ইরানের বিদায়ে বিদ্রুপাত্মক আনন্দ প্রকাশ করলেন, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কড়া জবাব দিয়ে বললেন, এটি আমেরিকার ‘নিচু মানসিকতা’ এবং তারা বিশ্বকাপ আয়োজনের যোগ্যতাই রাখে না।
তবে ইরান জিতেছে অন্য জায়গায়। তিজুয়ানা ছাড়ার আগে মেক্সিকানদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে হোটেলের দেয়ালে ইরানি ফুটবলাররা একটা চিঠি রেখে এসেছিলেন। সেই হাতে লেখা চিঠির প্রতিটি শব্দ বিশ্ব ফুটবলের বিবেকের মুখে আস্ত এক একটি চড়:
আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা আর ফিফার দ্বিমুখী আচরণের কাছে টিম মেল্লি হয়তো হেরে গেছে, কিন্তু তিজুয়ানার দেয়ালে লেখা ‘সীমানাহীন দল’ কথাটি প্রমাণ করে দিয়ে গেছে। রাজনীতির নোংরা বুট দিয়ে ফুটবলের আত্মাকে কখনো পিষে ফেলা যায় না। ইরানের এই লড়াই বিশ্বকাপ না জেতার, কিন্তু মানুষের হৃদয় জয়ের এক ট্র্যাজিক মহাকাব্য।