যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখনই কোনো উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বসবে না বলে জানিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার দেশটির কর্মকর্তারা বলেছেন, সাম্প্রতিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছানো যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাদের কোনো বৈঠকের পরিকল্পনা নেই।
ইরানের কর্মকর্তারা বলেছেন, দুই সপ্তাহ আগে হওয়া যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো আগে পুরোপুরি চূড়ান্ত করতে হবে। এরপরই পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতাসহ জটিল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে। এতে বোঝা যাচ্ছে, প্রাথমিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে এখনো দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ দোহায় পৌঁছেছেন। হোয়াইট হাউস এই সফরকে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানিয়েছে, এই অচলাবস্থা কাটাতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি বিবেচনা করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনের সঙ্গে সম্ভাব্য নতুন হামলা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে রয়টার্স স্বাধীনভাবে এ তথ্য নিশ্চিত করতে পারেনি। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আপাতত ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপের বদলে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরো কিছু সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে তিনি প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে আরো হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।
যুদ্ধের কারণে কিছুদিন ব্যাহত থাকার পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে আবার আংশিকভাবে জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে যেত। ইরানের কর্মকর্তারা বলেছেন, হরমুজ প্রণালির অপর প্রান্তে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে এই জলপথ পরিচালনার অধিকার তাদের রয়েছে। তারা আরো জানিয়েছেন, ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হলে, অর্থাৎ আগস্টের মাঝামাঝি থেকে এই পথ ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি নেওয়া হবে। ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, হরমুজ প্রণালির সার্বভৌম অধিকার ইরান ও ওমানের। এই জলপথে কীভাবে জাহাজ চলাচল করবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও ইরানের রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স স্পষ্টভাবে বলেছেন, আন্তর্জাতিক এই নৌপথ ব্যবহারকারী জাহাজ থেকে ইরানকে কোনো ধরনের ফি আদায় করতে দেওয়া হবে না। 'দ্য মাইকেল নোলস শো'তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজকে ইরানকে অর্থ দেওয়ার মত পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত তৈরি হবে না। তিনি আরো দাবি করেন, তেল পরিবহন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। যা প্রায় যুদ্ধের আগের অবস্থায় পৌঁছে গেছে। কিছু দিনে পরিবহনের পরিমাণ আগের চেয়েও বেশি ছিল। তবে এ বিষয়ে তিনি কোনো পরিসংখ্যান দেননি।
যুদ্ধের অনিশ্চয়তা থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। এর আগে বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কয়েকটি সামরিক স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায়। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) মঙ্গলবার জানিয়েছে, জ্বালানি বাজারে চাপ কিছুটা কমলেও দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোতে এখনো খাদ্য ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জ্বালানি বিক্রেতাদের পেট্রোলের দাম কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যবর্তী এই চুক্তিতে লেবাননে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত বন্ধের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে হিজবুল্লাহর মিত্র এবং লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি, লেবানন-ইসরায়েলের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া পৃথক একটি কাঠামোগত চুক্তি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, এই কাঠামোয় দক্ষিণ লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। ফলে পুরো শান্তি প্রক্রিয়া আরো দীর্ঘ ও জটিল হয়ে পড়তে পারে।