মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতির জেরে সৃষ্ট সংকটে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র সুস্পষ্ট বিজয়ী হিসেবে চীনের নাম উঠে এসেছে। ভূরাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এশিয়া গ্রুপের এক প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে।
এশিয়া গ্রুপ মঙ্গলবার (৩০ জুন) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেছে, হরমুজ প্রণালি সংকট থেকে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্যের বাজারের অস্থিরতা সফলভাবে মোকাবিলা করেছে চীন। একই সঙ্গে এ সংঘাতের ফলে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন থেকেও লাভবান হওয়ার অবস্থানে রয়েছে দেশটি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের সরকারি ও সামরিক স্থাপনায় যৌথ হামলা চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করার পর ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস পরিবহনের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা দেখা দেয়, যার সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে এশিয়ায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার আগে এ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত তেলের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ৯০ শতাংশই এশিয়ার বাজারে যেত। এছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্যও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে এই পথেই পরিবহন করা হতো।
গবেষণায় চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান দেশগুলোর ওপর সংকটের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। উৎপাদনশিল্প, জ্বালানি ও কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে এর প্রভাবও মূল্যায়ন করা হয়।
প্রতিবেদনের বলা হয়, ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য অভিযান থেকে সৃষ্ট সংকটের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়েছে চীন। কারণ বিশাল তেল মজুত এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপক বিনিয়োগের কারণে অন্যান্য দেশের তুলনায় জ্বালানি সংকটের ধাক্কা অনেক কম অনুভব করেছে দেশটি।
দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত জ্বালানি মজুত গড়ে তুলছে বেইজিং। গত বছর কম দামের সুযোগ নিয়ে আরও বড় আকারে তেল মজুত করেছে দেশটি। বৈশ্বিক জ্বালানি নীতিবিষয়ক কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ গবেষক এরিকা ডাউন্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি দৈনিক ১ কোটি ১১ লাখ ব্যারেল থেকে বেড়ে ১ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেলে পৌঁছায়। এর মধ্যে অতিরিক্ত আমদানির ৮০ শতাংশেরও বেশি সরাসরি মজুত করা হয়। চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত চীনের মজুত তেল ২০২৫ সালের আমদানির হারে ১০৪ দিনের চাহিদা পূরণে সক্ষম ছিল।
একই সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে চীন। গত বছর দেশটি ৩১৫ গিগাওয়াট নতুন সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করেছে, যা বিশ্বে নতুন স্থাপিত মোট সৌরবিদ্যুতের অর্ধেকেরও বেশি। এর আগের বছর যুক্ত হয়েছিল ২৭৭ গিগাওয়াট।
২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট জ্বালানির অর্ধেক জীবাশ্ম জ্বালানিবহির্ভূত উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বেইজিং। একই সময়ে বায়ু ও সৌরশক্তির অংশ ২০২৫ সালের ২২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। যদিও এখনো চীনের মোট জ্বালানির ৫০ শতাংশের বেশি কয়লাভিত্তিক, তবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ দ্রুত বাড়ছে।
এশিয়া গ্রুপের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইতোমধ্যে ১ দশমিক ৪ টেরাওয়াট নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ সক্ষমতা চালু থাকা এবং ৯০ থেকে ১১০ দিনের অপরিশোধিত তেলের কৌশলগত মজুত থাকায় আঞ্চলিক অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় প্রাথমিক ধাক্কা সবচেয়ে ভালোভাবে সামাল দিয়েছে চীন।
এছাড়া সংকটের কারণে অন্যান্য দেশ যখন পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে, তখনো লাভবান হচ্ছে বেইজিং। সৌর প্রযুক্তি ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরঞ্জামের বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় আধিপত্য রয়েছে চীনের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি কম দামে এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানি করছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর নিজস্ব শিল্পের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ি রপ্তানি মে মাসে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। একইভাবে এপ্রিল মাসে সৌর প্যানেল রপ্তানি বেড়েছে ৬০ শতাংশ।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। মে মাসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দাবি করেছিলেন, সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় দুই দেশই।
তবে এশিয়া গ্রুপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে এমন একটি অস্থিতিশীলতাসৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে বেইজিং, যার মধ্যপ্রাচ্য নীতি পুরো বিশ্বের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে চীনের জন্য কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। সিঙ্গাপুরের এস. রাজরত্নম আন্তর্জাতিক গবেষণা বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ ফেলো ড্রু থম্পসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমে যাওয়া চীনের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে লাভজনক নয়। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প নিরাপত্তা প্রদানকারী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী নয় বেইজিং।
তাইওয়ানভিত্তিক আটলান্টিক কাউন্সিলের গ্লোবাল চায়না হাবের নন-রেসিডেন্ট ফেলো ওয়েন-তি সুং বলেন, এ সংকট ভবিষ্যতে তাইওয়ানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযান নিয়ে চীনকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে। কারণ, শত্রুতাপূর্ণ পরিবেশে সমুদ্রপথে জাহাজ পরিচালনার জটিলতা এই সংকটে স্পষ্ট হয়েছে।
তবে বেইজিং এই সংকটকে অস্তিত্বের হুমকি হিসেবে নয়, বরং এমন একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে, যা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করা এবং সুযোগে পরিণত করা সম্ভব।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান