চলতি বিশ্বকাপ ইরানের জন্য শুরু হয়েছিল যুদ্ধের ছায়ায়। মাঠে প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম কিংবা মিসর। কিন্তু মাঠের বাইরে প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে ভিসা, ভ্রমণ বিধিনিষেধ, নিরাপত্তা-রাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের টানাপোড়েন। এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি-সমঝোতার কথা সামনে আসায় প্রশ্ন উঠছে, এতে কি স্বস্তি পাবে ইরান জাতীয় দল?
ইরান, যাদের ডাকনাম টিম মেল্লি, বিশ্বকাপের গ্রুপ ‘জি’-তে খেলছে। তাদের তিনটি গ্রুপ ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রে। কিন্তু রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে শুরু থেকেই দলটির প্রস্তুতিতে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়। প্রথম ম্যাচের মাত্র কয়েক দিন আগেও ইরান দলের ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। পরে খেলোয়াড়েরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পেলেও দলের কয়েকজন প্রশাসনিক ও টেকনিক্যাল স্টাফ ভিসা জটিলতায় পড়েন।
এরপর ইরান তাদের বেস ক্যাম্প সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনা থেকে মেক্সিকোর তিহুয়ানায়। ম্যাচ খেলতে যুক্তরাষ্ট্রে ঢুকতে হচ্ছে, ম্যাচ শেষে আবার বেরিয়ে যেতে হচ্ছে। ইরানের দাবি, এই নিয়ম তাদের প্রস্তুতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের দুই দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার আবেদনও নাকচ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ইরান ফুটবল ফেডারেশন। এই ভ্রমণ বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে ফিফাতে অভিযোগ করার কথাও জানিয়েছে তারা।
এই প্রেক্ষাপটেই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি-সমঝোতার খবর। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চুক্তির কোনো প্রকাশ্য কপি এখনো দুই পক্ষ ছাড়েনি, আর বিশ্বকাপ-সংক্রান্ত কোনো বিশেষ ধারাও জানা যায়নি। তবু বিশেষজ্ঞদের আশা, সম্পর্কের বরফ কিছুটা গললে ইরান দলের ওপর চাপ কমতে পারে।
ইরানি-আমেরিকান রাজনৈতিক বিশ্লেষক নেগার মোর্তাজাভি আল জাজিরাকে বলেছেন, শান্তি-সমঝোতার ফলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরান দলের প্রতি সদিচ্ছার কিছু পদক্ষেপ দেখায়, তাহলে ভ্রমণ ও ভিসা জটিলতার কিছু বাধা কমতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভাষাতেও ইরান প্রসঙ্গে কিছুটা নরম সুর দেখা গেছে।
তবে আশার সঙ্গে সতর্কতাও আছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিকি আখাভান মনে করেন, চুক্তির পরও চাপ থাকবে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে ইরানবিরোধী কড়া অবস্থানের রাজনৈতিক চাপ, রিপাবলিকান কট্টরপন্থী, ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠী এবং ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা, সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন যে একেবারে সহজ পথে যাবে, তা নিশ্চিত নয়।
এর মধ্যেও সামান্য নমনীয়তার একটি উদাহরণ দেখা গেছে। ইরান উইঙ্গার মেহদি তোরাবির ভিসা নিউজিল্যান্ড ম্যাচের পর মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেলে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত তাঁকে মাল্টিপল-এন্ট্রি ভিসা দেয়। বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ এটিকে নমনীয়তার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। কিন্তু সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। কারণ এরপরই বেলজিয়াম ম্যাচের আগে ইরানের আগেভাগে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার আবেদন নাকচ হওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ইরানের কোচ আমির গালেনোয়ি আগেই তাঁর দলকে এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে থাকা দলগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, মাঠের বাইরে বাধাগুলো দলকে স্বাভাবিক প্রস্তুতির সুযোগ দিচ্ছে না। ফুটবলারদের জন্য বিষয়টি শুধু ভ্রমণের ঝামেলা নয়, মানসিক চাপও। তারা বিশ্বকাপ খেলতে এসেছে, কিন্তু প্রতিটি ম্যাচের আগে রাজনৈতিক বাস্তবতা তাদের ঘিরে থাকছে।
ইরান দলের জন্য সমস্যা আরও গভীর। তাদের সমর্থকদের টিকিট বরাদ্দ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ করেছে ইরান। টুর্নামেন্ট শুরুর আগে তাদের টিকিট বরাদ্দ প্রত্যাহার করা হয়েছে বলে দাবি ওঠে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ইরানের ম্যাচ শুধু মাঠের নয়, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রবাসী ইরানিদের আবেগের জায়গাতেও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও আয়োজকদের পক্ষের যুক্তিও আছে। এপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিফার সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দলগুলো সাধারণত ম্যাচের আগের দিন ভেন্যু শহরে যায় এবং ম্যাচ শেষে বেস ক্যাম্পে ফিরে যায়। অনেক দলই এমন সূচি অনুসরণ করছে। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে বিষয়টি আলাদা হয়ে যাচ্ছে, কারণ ভিসা সমস্যা, রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং নিরাপত্তা বিধিনিষেধ একসঙ্গে কাজ করছে।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় কথা হলো সমতা। মাঠে সবাই ১১ জন নিয়ে নামে, কিন্তু প্রস্তুতির সুযোগও যতটা সম্ভব সমান হওয়া উচিত। ইরানের অভিযোগ, তাদের প্রস্তুতি সেই সমতা পাচ্ছে না। ম্যাচের আগে ভ্রমণ, সীমিত অবস্থান, স্টাফ ভিসা সমস্যা ও বেস ক্যাম্প বদলের মতো বিষয়গুলো প্রতিপক্ষের তুলনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে বলে মনে করছে তারা।
এখন প্রশ্ন, শান্তি-সমঝোতা এই পরিস্থিতি কতটা বদলাবে। যদি যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন সম্পর্ক উন্নয়নের প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবে ইরান দলের ভ্রমণ শর্ত কিছুটা সহজ করে, তাহলে টিম মেল্লি অন্তত ম্যাচের আগে স্বাভাবিক প্রস্তুতির সুযোগ পেতে পারে। বিশেষ করে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচ ও সম্ভাব্য নকআউট পর্বে এই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
গ্রুপের দিক থেকেও ইরানের সামনে বড় লড়াই। নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে ২-২ ড্র দিয়ে তারা শুরু করেছে। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গ্রুপ ‘জি’-তে চার দলই প্রথম রাউন্ড শেষে এক পয়েন্টে ছিল। এক জয় গ্রুপের হিসাব বদলে দিতে পারে, আবার এক হার ইরানকে বিপদে ফেলতে পারে।
এই অবস্থায় মাঠের বাইরের প্রতিটি বাধা ইরানের জন্য বড় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মেহদি তারেমি, রামিন রেজাইয়ান, মোহাম্মদ মোহেবিদের মাঠে লড়তে হবে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। কিন্তু টিম মেল্লিকে একই সঙ্গে লড়তে হচ্ছে যাতায়াত, ভিসা, রাজনীতি ও মানসিক চাপের বিরুদ্ধেও।
ফুটবলকে প্রায়ই রাজনীতির বাইরে রাখার কথা বলা হয়। কিন্তু ইরানের বিশ্বকাপ দেখাচ্ছে, বড় মঞ্চে রাজনীতি কখনো পুরোপুরি বাইরে থাকে না। শান্তি-সমঝোতা যদি বাস্তব পরিবর্তন আনে, তাহলে ইরান অন্তত কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে। আর যদি সবকিছু আগের মতোই থাকে, তাহলে টিম মেল্লির বিশ্বকাপ অভিযান চলবে একই অস্বস্তি, একই অনিশ্চয়তা এবং একই চাপের মধ্যে।
আপাতত ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় কথা একটাই: চুক্তি কাগজে থাকলেই হবে না, তার প্রভাব মাঠের প্রস্তুতিতে দেখা যেতে হবে। বিশ্বকাপে টিকে থাকতে হলে তাদের শুধু গোল করতে হবে না, মাঠের বাইরের এই জটিলতাও সামলাতে হবে।