মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সংকট তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি রেকর্ড ১২০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। শেয়ারবাজারে তৈরি হয় অস্থিরতা, দেখা দেয় বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা। তবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার ইঙ্গিত মিলতেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। কমেছে জ্বালানির দাম, ফিরছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া এই সমঝোতাকে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকট প্রশমনের পথে বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। সমঝোতা স্মারকের আওতায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অপরিসীম। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ শুরুর পর এই জলপথ ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়তে থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাই বাজারে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
এরই প্রভাবে গত এপ্রিলের শেষ দিকে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছে যায়, যা কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু সমঝোতা স্মারক ঘোষণার পর সেই চাপ দ্রুত কমতে শুরু করে। বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৮০ ডলারের আশপাশে নেমে এসেছে। একইভাবে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও ৮০ ডলারের নিচে অবস্থান করছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সমঝোতার ফলে তেলের দামে যুক্ত হওয়া ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে কমে গেছে। তবে সরবরাহব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে এখনো সময় লাগবে। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ থেকে ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হতো। সংঘাতের কারণে সেই প্রবাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, উৎপাদন ও সরবরাহ পুনরুদ্ধার ধাপে ধাপে এগোবে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত তুলনামূলক দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারলেও অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে কিছু দেশের ক্ষেত্রে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে বেশি সময় লাগতে পারে। বিভিন্ন পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক মাসে সরবরাহের বড় অংশ পুনরুদ্ধার সম্ভব হলেও পুরো অঞ্চলের জ্বালানিব্যবস্থা স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।
জ্বালানির দাম কমতে শুরু করায় বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও স্বস্তির বার্তা এসেছে। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং ভোক্তা পর্যায়ের মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। যুদ্ধ চলাকালে অর্থনীতিবিদেরা আশঙ্কা করেছিলেন, সরবরাহ সংকট দীর্ঘ হলে বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপে পড়তে পারে। সমঝোতার পর সেই আশঙ্কা অনেকটাই কমেছে।
এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার প্রধান শেয়ারবাজারগুলোতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীরা আবারও উৎপাদন ও ভোক্তানির্ভর খাতে অর্থ বিনিয়োগ শুরু করেছেন। কারণ, জ্বালানির দাম কমলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমে এবং মুনাফার সম্ভাবনা বাড়ে।
শুধু শেয়ারবাজার নয়, অন্যান্য আর্থিক সম্পদেও এর প্রভাব পড়েছে। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা কিছুটা কমেছে। অন্যদিকে বিটকয়েনসহ ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও কিছুটা কমেছে, যা বাজারে স্বস্তি ফেরার আরেকটি ইঙ্গিত।
তবে অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। সমঝোতা স্মারকের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এখনো আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরিধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজে জাহাজ চলাচল কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় এবং যুদ্ধবিরতির শর্তগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই নির্ধারণ করবে বর্তমান স্বস্তি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। তবে আপাতত একটি বিষয় স্পষ্ট— মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যে অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা তার অনেকটাই লাঘব করেছে। তেলের দাম থেকে শেয়ারবাজার— বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রায় সব সূচকেই এখন সেই স্বস্তির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।