বিংশ শতাব্দীতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েল ও আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে দুটি শান্তি চুক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করেছিল এবং সিরিয়ার সঙ্গে তৃতীয় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তির কাছাকাছিও পৌঁছেছিল।
এই চুক্তিগুলো এসেছিল কয়েক দশকের ধারাবাহিক যুদ্ধের পর: ১৯৫৬ সালের ত্রিপক্ষীয় আগ্রাসন, ১৯৬৭ সালের নাকসা, ১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধ, ১৯৭৮ সালে লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন এবং ১৯৮২ সালে বৈরুত আক্রমণের পর।
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে প্রকৃত শান্তির পথে এগিয়ে নিতে চাপ দেওয়া ছেড়ে দিয়েছে। এর পরিবর্তে, তারা পুরো অঞ্চলে ইসরায়েলের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তাকে সহায়তা করেছে।
এর ফল হলো, এখন ওয়াশিংটনের যখন অঞ্চলে একটি শান্তিচুক্তি করা এবং তা টিকিয়ে রাখার প্রয়োজন, তখন তারা তা করতে পারছে না। কারণ বহুদিন ধরে যে ইসরায়েলি আগ্রাসনকে তারা উসকে দিয়েছে, সেটিকে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।
ইসরায়েলের দুটি পথ
ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতারা এমন এক ভূখণ্ডে বসতি-ঔপনিবেশিক প্রকল্প পরিচালনার উদ্বেগে ভুগতেন, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ছিল আরব এবং অঞ্চলটি ইসলামের প্রভাবাধীন ছিল। ফলে এই অস্তিত্বগত উদ্বেগ মোকাবিলায় তারা দুটি পথ তৈরি করেছিলেন।
প্রথমটি ছিল শক্তি ও সামরিক নিষ্ঠুরতার নীতি, যা সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছিলেন ফিলিস্তিনে ইরগুন সন্ত্রাসী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা জেভ জাবোটিনস্কি। তিনি ১৯২৩ সালে প্রকাশিত দ্য আয়রন ওয়াল শীর্ষক প্রবন্ধে লিখেছিলেন:
‘জায়নবাদী উপনিবেশায়ন হয় থামতে হবে, নয়তো স্থানীয় জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যেতে হবে। অর্থাৎ এটি কেবল এমন একটি শক্তির সুরক্ষায় এগোতে ও বিকশিত হতে পারে, যা স্থানীয় জনগণের নিয়ন্ত্রণের বাইরে— একটি লৌহপ্রাচীরের আড়ালে, যা স্থানীয় জনগণ ভেদ করতে পারবে না।’
ইসরায়েলের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন-গুরিয়নও বিশ্বাস করতেন, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইসরায়েলকে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যকে বদলে দিতে হবে।
কয়েক দশক পরে তখনকার লিকুদ নেতা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার ১৯৯৩ সালের A Place Among the Nations বইয়ে লেখেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যকে এমনভাবে বদলাতে হবে, যা তার অনুকূলে যায়। তিনি যুক্তি দেন, ইসরায়েল যদি তার বিপুল সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে না পারে, তবে টিকে থাকতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি এই নীতিতেই অটল থেকেছেন, যা অঞ্চলজুড়ে মৃত্যু, ধ্বংস ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করেছে।
দ্বিতীয় পথটি ১৯৭৩ সালের অক্টোবর যুদ্ধের পর উদ্ভূত হয়, যখন ইসরায়েল অস্তিত্বগত বিপর্যয়ের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। এর ফলে ‘শান্তির মাধ্যমে অস্তিত্ব’ ধারণার জন্ম হয়, যার আওতায় ইসরায়েল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে অঞ্চলের সঙ্গে একীভূত হওয়ার চেষ্টা করে।
এই নীতির সমর্থকেরা ‘ভূমির বিনিময়ে শান্তি’ সমাধানের পক্ষে ছিলেন, যার মাধ্যমে ইসরায়েল ১৯৬৭ সালে দখল করা ভূখণ্ড ফিরিয়ে দেবে এবং এর বিনিময়ে স্বীকৃতি ও শান্তি পাবে।
এই নীতি দ্রুত ফলও দেয়। ১৯৭৮ সালে ইসরায়েল মিসরের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করে, যার ফলে সিনাই উপদ্বীপ মিসরের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯৪ সালে জর্ডানের সঙ্গেও শান্তিচুক্তি হয় এবং কিছু দখলকৃত এলাকা ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অসলো চুক্তিও ছিল এই প্রক্রিয়ার অংশ।
প্রধানমন্ত্রী ইৎজাক রাবিনের সরকারও সিরিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তির বিনিময়ে সম্পূর্ণ দখলকৃত গোলান মালভূমি ফিরিয়ে দিতে প্রস্তুত ছিল বলে জানা যায়। কিন্তু ১৯৯৫ সালের শেষদিকে জায়নবাদী উগ্রপন্থীদের হাতে রাবিন নিহত হন।
এরপর থেকে ইসরায়েল ধীরে ধীরে আবার ‘আয়রন ওয়াল’ নীতিতে ফিরে যায়, যা বর্তমানে সবচেয়ে চরম রূপ নিয়েছে।
ইসরায়েলের এই পশ্চাৎমুখী অবস্থানের জবাবে আরব রাষ্ট্রগুলো একই ধরনের আগ্রাসী অবস্থান নেয়নি। বরং ২০০২ সালে তারা বৈরুত আরব শান্তি উদ্যোগ উপস্থাপন করে, যেখানে আবারও ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগ বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ১৯৬৭ সালে দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড ও গোলান মালভূমি ফিরিয়ে দিয়ে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিনিময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হবে। কিন্তু এই উদ্যোগ ইসরায়েলে কোনো গুরুতর বিবেচনার মুখ দেখেনি।
শান্তির বদলে আধিপত্যের পথ
ইসরায়েলের আগ্রাসী নীতিতে ফিরে যাওয়ার পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি দায়ী নয়। যুক্তরাষ্ট্রও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইসরায়েলি সরকার ও সেনাবাহিনীর কঠোর আচরণের ওপর কোনো সীমা আরোপ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে ওয়াশিংটন এমন আচরণ করেছে যেন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল ছাড়া আর কোনো রাষ্ট্রের বৈধ স্বার্থ নেই।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুই মেয়াদে ইসরায়েলের আধিপত্যবাদী পরিকল্পনায় মার্কিন সহায়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এটি শুধু আর্থিক সহায়তা, কূটনৈতিক সুরক্ষা, দখলকৃত ভূখণ্ডকে স্বীকৃতি দেওয়া কিংবা সামরিক সমর্থনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
দীর্ঘদিনের মার্কিন নীতির বিপরীতে গিয়ে ট্রাম্প আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনি প্রশ্নকে কার্যত সমাধিস্থ করার চেষ্টা করেছেন। এই চুক্তিগুলো ‘ভূমির বিনিময়ে শান্তি’ নীতিকে মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। এর পরিবর্তে বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ‘হত্যা, ধ্বংস ও যুদ্ধ না করার বিনিময়ে শান্তি’ সূত্রকে এগিয়ে নিচ্ছে।
ট্রাম্প ইসরায়েলকে পুরো অঞ্চলে অবাধে অভিযান চালানোর সুযোগও দিয়েছেন। গত বছর মাত্র ৭২ ঘণ্টায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ছয়টি আরব দেশে হামলা চালায়। বিস্ময়করভাবে এর মধ্যে কাতারও ছিল, যেখানে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের অগ্রবর্তী সদরদপ্তর অবস্থিত।
তবে ট্রাম্প কতটা দূর পর্যন্ত ইসরায়েলের কঠোর এজেন্ডাকে সমর্থন করেছেন, তার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ হলো ইরানের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধ। লেখকের মতে, এই যুদ্ধ কেবল ইসরায়েলের স্বার্থে হয়েছে এবং তা যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ নীতির স্বার্থ, এমনকি তার আরব মিত্রদের স্বার্থেরও বিরুদ্ধে গেছে।
এভাবে ট্রাম্প প্রশাসন আরব রাষ্ট্রগুলোকে প্রান্তিক করে দিয়েছে, যাদের নিজেদের অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের এমন একটি আঞ্চলিক পুনর্গঠনের খরচ বহন করতে বাধ্য করা হয়েছে, যা নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাদের নিজস্ব সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতার সঙ্গে নয়।
‘শান্তি ও স্থিতিশীলতা’র মোড়কে উপস্থাপিত এই সামরিক বিশৃঙ্খলা অঞ্চলটির জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না।
ইরানের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্মত যুদ্ধবিরতি চুক্তি গ্রহণে ইসরায়েলের অনীহা প্রমাণ করে, নিঃশর্ত সমর্থন পেলে আগ্রাসনের পরিণতি কী হতে পারে। আলোচনার পুরো প্রক্রিয়াজুড়ে ইসরায়েলি সরকার লেবাননে হামলা চালিয়ে বিভিন্ন ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধের প্রচেষ্টাকে বারবার নস্যাৎ করেছে। ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সঙ্গে ফোনে বা বিবৃতিতে যত কঠোর ভাষাই ব্যবহার করুন না কেন, এই আচরণ অব্যাহত থাকবে।
ট্রাম্প এবং তার উত্তরসূরিদের বুঝতে হবে, মধ্যপ্রাচ্যে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইসরায়েল বিষয়ে মার্কিন নীতিকে পুরোপুরি বদলাতে হবে। আব্রাহাম চুক্তির মতো আধিপত্যবাদী ব্যবস্থাকে ‘শান্তি চুক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করে অঞ্চলের চলমান সংঘাতের সমাধান হবে না এবং ভবিষ্যতের সংঘাতও ঠেকানো যাবে না।
অঞ্চলের জনগণ বর্তমান সম্প্রসারণবাদী রূপের ইসরায়েলকে মেনে নেবে না, আব্রাহাম চুক্তিকে যতই প্রচার করা হোক না কেন।
জনমত জরিপও সেই বাস্তবতা তুলে ধরে। ২০২৫ সালের আরব ওপিনিয়ন ইনডেক্স জরিপে ৮৭ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া ও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিরোধিতা করেছেন। একই জরিপে ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা যুক্তরাষ্ট্রকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি এই আধিপত্যবাদী ও আগ্রাসী ইসরায়েলকে সমর্থন করবে, ততই অঞ্চল ও তার জনগণের সমর্থন হারাবে। ইরান যুদ্ধের ফলে নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বদলে যাওয়ায়, ক্রমবর্ধমান বহুমেরু বিশ্বে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলে ওয়াশিংটন একসময় তার প্রভাব হারাতে পারে।
যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই তার অবস্থান ধরে রাখতে চায়, তবে তার সামনে দুটি পথ খোলা: হয় ইসরায়েলকে নিজেকে পরিবর্তন করে ‘শান্তির মাধ্যমে অস্তিত্ব’ নীতিতে ফিরতে চাপ দেওয়া, যা ফিলিস্তিন প্রশ্নের ন্যায়সঙ্গত সমাধানের ওপর ভিত্তি করে; অথবা তাকে ছেড়ে দেওয়া।
হুসেইন চোকর বৈরুতভিত্তিক নীতিবিশেষজ্ঞ। তিনি আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতে কাজ করেছেন এবং ‘সার্চ ফর কমন গ্রাউন্ড’-এ সংঘাত বিশ্লেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি ইউনাইটেড নেশনস ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর ওয়েস্টার্ন এশিয়ার (ইএসসিডব্লিউএ) সুশাসন ও আর্থসামাজিক গবেষক হিসেবেও কাজ করেছেন।
[নিবন্ধটি আল জাজিরায় প্রকাশিত, ইংরেজি থেকে অনূদিত]