Image description

গাজায় ইসরায়েলের নৃশংস সামরিক অভিযান ও গণহত্যার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সবচেয়ে সোচ্চার দেশগুলোর একটি ব্রাজিল। দেশটির প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা ডি সিলভা বারবার গাজার পরিস্থিতিকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তবে মুখে ফিলিস্তিনের অধিকারের কথা বললেও পর্দার আড়ালে ইসরায়েলের কাছে সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ সচল রেখেছে ব্রাজিল সরকার।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে লাতিন আমেরিকার এই পরাশক্তির এমন চরম কূটনৈতিক দ্বিমুখী নীতি ও বৈপরীত্যের চিত্র ফুটে উঠেছে।

 

প্রতিবেদনে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) গাজায় গণহত্যার ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করার পরও ব্রাজিলসহ বিশ্বের অন্তত ৫১টি দেশ ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো অব্যাহত রেখেছে। ইসরায়েলি কর কর্তৃপক্ষের (আইটিএ) গোপন আমদানি তথ্য ও কাস্টমস রেকর্ড বিশ্লেষণ করে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে।

বিশ্বমঞ্চে ফিলিস্তিনের পক্ষে ব্রাজিল

ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের পক্ষে থাকার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে ব্রাজিলের। বিশেষ করে বর্তমান বামপন্থি প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা ডি সিলভার আমলে এই অবস্থান অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও স্পষ্ট রূপ নিয়েছে।

 

২০১০ সালে ব্রাজিল সরকার ১৯৬৭ সালের সীমান্ত অনুযায়ী ফিলিস্তিনকে (Palestine) একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়। ২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের (Israel) বিরুদ্ধে অন্যতম সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে ব্রাজিল। প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে গাজায় ইসরায়েলি হামলাকে ‘গণহত্যা’ (Genocide) হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ‘এটি কোনো সাধারণ যুদ্ধ নয়, এটি একটি আধুনিক যুগের সুপরিকল্পিত গণহত্যা, যেখানে নারী ও শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।’

২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যে গণহত্যার মামলা দায়ের করে, ব্রাজিল শুরু থেকেই তাতে প্রকাশ্যে সমর্থন দেয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিজে (ICJ) বিধির ৬৩ নম্বর অনুচ্ছেদ ব্যবহার করে এই মামলায় পক্ষভুক্ত হওয়ার আবেদন করে। এর মাধ্যমে ব্রাজিল ‘গাজায় ইসরায়েলি গণহত্যার’ আইনি লড়াইয়ে সরাসরি অংশীদার হয়।

গোপনে ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রি

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত গাজায় যুদ্ধ চলাকালে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইসরায়েলে বড় অংকের সামরিক চালান গেছে। এর মধ্যে ব্রাজিল থেকে যাওয়া সামরিক সরঞ্জামের মোট আর্থিক মূল্য ছিল ২৪ লাখ মার্কিন ডলার।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা ডি সিলভা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজেকে গাজার পক্ষে জাহির করলেও দেশের ভেতর থেকে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) কাছে সামরিক পণ্য পৌঁছানো বন্ধ করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেননি। ব্রাজিলের এই অবস্থানকে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা ‘কূটনৈতিক দ্বিমুখী নীতি’ (Diplomatic Double Standards) এবং ‘বক্তব্য ও বাস্তবতার চরম বৈপরীত্য’ হিসেবে অভিহিত করেছেন তারা।

আর্জেন্টিনার চেয়ে ৬৫ গুণ বেশি অস্ত্র ব্রাজিলের

আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ব্রাজিল যখন ইসরায়েলে ২৪ লাখ মার্কিন ডলারের অস্ত্র সরঞ্জাম পাঠিয়েছে, তখন চরম ডানপন্থি ও প্রকাশ্যে ইসরায়েলের পক্ষ নেওয়া প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনা ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে ৩৭ হাজার মার্কিন ডলারের।

গাণিতিক হিসাবে, মুখে ফিলিস্তিনপন্থি দাবি করা ব্রাজিল তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার তুলনায় প্রায় ৬৫ গুণ বেশি মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম ও যুদ্ধের কাঁচামাল ইসরায়েলের কাছে বিক্রি করেছে।

ব্রাজিল সরকারের বক্তব্য

ব্রাজিলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটি ২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ইসরায়েলে প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত কোনো নতুন রপ্তানির অনুরোধ অনুমোদন করেনি। তবে, কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণির পণ্য—যার মধ্যে রয়েছে আগ্নেয়াস্ত্রের কিছু যন্ত্রাংশ, আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম, ছোট ক্যালিবারের গোলাবারুদ, প্রতিরক্ষা-সম্পর্কিত উৎপাদন সামগ্রী এবং সামরিক প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম—পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদনের আওতাভুক্ত নয়।

আইসিজের সতর্কবার্তার পরেও অস্ত্র রপ্তানি

আল জাজিরার অনুসন্ধান বলছে, আলোচ্য সময়ে ইসরায়েলে মোট ২ হাজার ৬০০টির বেশি সামরিক চালানের মাধ্যমে প্রায় ৮৮ কোটি ৫৬ লাখ মার্কিন ডলারের (প্রায় ৩২২ কোটি ইসরায়েলি শেকেল) অস্ত্র ও সরঞ্জাম প্রবেশ করেছে। মোট চালানের ৯১ শতাংশেরই সরবরাহ হয়েছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজ) ঐতিহাসিক সতর্কবার্তার পর।

ওইদিন আইসিজের রায়ে বলা হয়, গাজায় গণহত্যার একটি বাস্তবসম্মত ঝুঁকি রয়েছে। এটি প্রতিরোধে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন আন্তর্জাতিক বিচার আদালত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি গণহত্যা কনভেনশনের ১৫৩টি পক্ষভুক্ত সব রাষ্ট্রকে তাদের বাধ্যবাধকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়: গণহত্যা প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

তবে আইসিজের সেই সতর্কবার্তার পরেও ইসরায়েলকে অস্ত্র দিয়ে গেছে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাসহ বিভিন্ন দেশ।

ব্রাজিল জোর দিয়ে বলেছে, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (ICJ) পদক্ষেপগুলো আইনত বাধ্যতামূলক এবং এর পূর্ণ ও অবিলম্বে পরিপালনের আহ্বান জানিয়েছে তারা। অথচ গাজাযুদ্ধ চলাকালীন দেশটি থেকে ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জামের চালানের মোট পরিমাণ ছিল ২৪ লাখ ডলারের, যার প্রায় ৮০ শতাংশই গেছে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আইসিজের সতর্কবার্তার পরে।

তালিকায় থাকা শীর্ষ ৫ দেশ

ইসরায়েলে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানো শীর্ষ পাঁচটি দেশ হলো:

  • যুক্তরাষ্ট্র: বরাবরের মতোই শীর্ষ সরবরাহকারী। মোট আমদানির ৪২ শতাংশেরও বেশি অর্থ এসেছে মার্কিন অস্ত্র ও গোলাবারুদ থেকে।
  • ভারত: এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে থাকা ভারত ইসরায়েলি ড্রোন ও যুদ্ধাস্ত্রের একটি বড় অংশ জোগান দিয়েছে।
  • রোমানিয়া: পূর্ব ইউরোপের এই দেশটি থেকে বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ও সামরিক যন্ত্রাংশ গেছে ইসরায়েলে।
  • তাইওয়ান: উন্নত চিপ ও প্রযুক্তিগত সামরিক সহায়তা নিশ্চিত করেছে অঞ্চলটি।
  • চেক প্রজাতন্ত্র: ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে অন্যতম প্রধান অস্ত্র জোগানদার হিসেবে কাজ করেছে তারা।

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই ইউরোপের অস্ত্র সরবরাহ

প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় মানবিক বিপর্যয় চলায় যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং স্পেনের মতো দেশগুলো প্রকাশ্যে ইসরায়েলে অস্ত্র বিক্রির ওপর আংশিক নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধের কথা বলেছিল। কিন্তু বাস্তবে কাস্টমস ডেটা বলছে ভিন্ন কথা।

২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার আগপর্যন্ত এসব দেশ থেকে নিয়মিত সামরিক চালান ইসরায়েলে প্রবেশ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি তৈরি অস্ত্র না পাঠিয়ে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের (যেমন নেদারল্যান্ডসের রটারড্যাম বন্দর) মাধ্যমে যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ ও বুলেটের কাঁচামাল পাঠানো হয়েছে।

বিশেষ করে, গাজায় ত্রাণপ্রার্থীদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর মর্মান্তিক ‘খাদ্য সহায়তা গণহত্যা’ বা ‘হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন ম্যাসাকার’-এর ঠিক আগের দিনগুলোতে ইসরায়েলে বুলেট ও ক্ষুদ্রাস্ত্রের যন্ত্রাংশ আমদানির পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল বলে আল-জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

গণহত্যা সনদের লঙ্ঘন

তালিকায় থাকা ৫১টি দেশের প্রায় সবাই জাতিসংঘের গণহত্যা সনদের (Genocide Convention) স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, যে কোনো রাষ্ট্রে গণহত্যার ঝুঁকি থাকলে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো সামরিক বা কৌশলগত সহায়তা বন্ধ করতে বাধ্য। আইসিজের স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও এই বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখায় আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, এই ৫১টি দেশ গাজায় চালানো যুদ্ধাপরাধ ও বেসামরিক নাগরিক হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে পারে না।

সূত্র: আল-জাজিরা