Image description

বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে ঐতিহাসিক অভিষেকের পর তার মোট সম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। আর সেই দিনই তার ব্যক্তিগত সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র একদিনে তার সম্পদ যে পরিমাণ বেড়েছে, তা বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশের সমান।

সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে আয় বলতে মাসিক বেতন বা ব্যবসা থেকে পাওয়া মুনাফাকে বোঝানো হয়। কিন্তু বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তাদের সম্পদের বড় অংশই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার, মালিকানা ও বিনিয়োগের মূল্য থেকে আসে। ফলে শেয়ারবাজারে কোনো প্রতিষ্ঠানের মূল্য হঠাৎ বেড়ে গেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের সম্পদের পরিমাণ কয়েক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য বলছে, স্পেসএক্স শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রথম দিনের লেনদেন শেষে মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদ প্রায় ৬২ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পায়। এর ফলে তার মোট সম্পদের পরিমাণ ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। বিশ্বের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো ব্যক্তি ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন।

হিসাব অনুযায়ী, একদিনে ৬২ বিলিয়ন ডলার সম্পদ বৃদ্ধির অর্থ প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৩১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর প্রতি মিনিটে তার সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা ৫০০ কোটির বেশি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক মিনিটে তার সম্পদের যে বৃদ্ধি ঘটেছে, তা দিয়ে দেশের অনেক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা সম্ভব।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল সম্পদ বৃদ্ধির মূল কারণ স্পেসএক্সের রেকর্ড আইপিও। শেয়ারবাজারে অভিষেকের পর প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। বর্তমানে কোম্পানিটির প্রায় ৩৮ শতাংশ মালিকানা মাস্কের হাতে রয়েছে। ফলে কোম্পানির মূল্যায়ন যত বেড়েছে, তার ব্যক্তিগত সম্পদও তত দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক বাজার বিশ্লেষক এই প্রবণতাকে ‘ইলন মাস্ক প্রিমিয়াম’ বলেও অভিহিত করছেন। তাদের মতে, মাস্কের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও নেতৃত্বের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাই তার প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ মূল্যায়নের অন্যতম কারণ।

তবে স্পেসএক্সই মাস্কের একমাত্র সম্পদের উৎস নয়। বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএআই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স, মস্তিষ্ক-কম্পিউটার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিউরালিংক এবং দ্য বোরিং কোম্পানিতে তার উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্ব রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত মূল্যায়নও তার সম্পদ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্বের অন্যান্য ধনকুবেরদের তুলনায়ও মাস্ক এখন অনেক এগিয়ে। অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস, গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ কিংবা মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ—সবার সম্পদের চেয়ে মাস্কের সম্পদের ব্যবধান এখন উল্লেখযোগ্য। প্রযুক্তি খাতে

বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ প্রযুক্তি ও ভবিষ্যৎ অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদই এই মূল্যায়নের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মাস্কের সম্পদ বৃদ্ধির এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির ধনী হওয়ার গল্প নয়।

এটি একই সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব, পুঁজিবাজারের শক্তি এবং সম্পদ বৈষম্যের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে। বিশ্বের বহু দেশের বার্ষিক বাজেটের চেয়েও বেশি সম্পদের মালিক একজন ব্যক্তি—এই বাস্তবতা বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে।

ইলন মাস্ক কে?

১৯৭১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন ইলন মাস্ক। বর্তমানে তিনি বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিত। অনলাইন পেমেন্ট সেবা প্রতিষ্ঠান পেপ্যালের প্রাথমিক সাফল্যের পর তিনি বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতা টেসলা, মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান এক্সএআই, মস্তিষ্ক-কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নিউরালিংক এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান দ্য বোরিং কোম্পানির মাধ্যমে প্রযুক্তি বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছেন।

পুনঃব্যবহারযোগ্য রকেট প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক যানবাহন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং মহাকাশ অনুসন্ধান নিয়ে তার উচ্চাভিলাষী উদ্যোগগুলো তাকে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে স্পেসএক্সের মাধ্যমে মহাকাশ প্রযুক্তি খাতে এবং টেসলার মাধ্যমে বৈদ্যুতিক গাড়ি শিল্পে তিনি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছেন।

স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে ঐতিহাসিক অভিষেকের পর ২০২৬ সালে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়ে আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন তিনি।

উল্লেখ্য, এখানে ‘আয়’ বলতে ইলন মাস্কের বেতন বা নগদ উপার্জন বোঝানো হয়নি; বরং স্পেসএক্সের শেয়ারমূল্য বৃদ্ধির ফলে একদিনে তার মোট সম্পদের যে বৃদ্ধি হয়েছে, সেটিই বোঝানো হয়েছে।