Image description

স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে অভিষেকের পর বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। স্পেসএক্সের বাজারমূল্য ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পর কোম্পানিটির প্রায় অর্ধেক মালিকানার সুবাদে তার সম্পদের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। এই অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ২৫ লাখের বেশি বাড়ি কেনা সম্ভব। শুধু তাই নয়, নির্মাণ করা যেতে পারে হাজারো আধুনিক হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অবকাঠামো প্রকল্প।

স্পেসএক্সের শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগেও বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি ছিলেন মাস্ক। টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে তার মালিকানাধীন শেয়ার ও স্টক অপশনের মূল্য ছিল প্রায় ২৭৯ বিলিয়ন ডলার। স্পেসএক্সের শেয়ার লেনদেন শুরু হওয়ার পর কোম্পানিটির প্রায় অর্ধেক মালিকানা থেকে তার সম্পদে আরও ৯৮২ বিলিয়ন ডলার যোগ হয়। ফলে টেসলা ও স্পেসএক্স—এই দুই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই তার মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন ডলারে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই সম্পদের বড় অংশই ‘কাগুজে সম্পদ’ বা পেপার ওয়েলথ। অর্থাৎ এটি নগদ অর্থ নয়; বরং টেসলা ও স্পেসএক্সের বাজারমূল্যের ওপর নির্ভরশীল। ভবিষ্যতে বিনিয়োগকারীরা কোম্পানি দুটির মূল্যায়ন যেভাবে করবেন, মাস্কের সম্পদের পরিমাণও সেভাবে বাড়তে বা কমতে পারে।

এক ট্রিলিয়ন ডলার কত বড় অঙ্ক?

এক ট্রিলিয়ন ডলার মানে একের পর ১২টি শূন্য—১,০০০,০০০,০০০,০০০ ডলার। অর্থাৎ এক মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার। এই পরিমাণ অর্থ একজন মানুষের পক্ষে একটি জীবদ্দশায় ব্যয় করা প্রায় অসম্ভব। কেউ যদি প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায় ১০ লাখ ডলার করে ব্যয় করেন, তাহলেও ১ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করতে এক শতাব্দীরও বেশি সময় লেগে যাবে।

সংবাদ সংস্থা এপি এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের পরিমাণ বোঝাতে সাধারণ সম্পদের সঙ্গে তুলনা যথেষ্ট নয়। বরং এটি এখন বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি, শিল্পখাত, মহাকাশ দূরত্ব এবং বৈশ্বিক সম্পদের সঙ্গে তুলনা করে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।

মাস্কের সম্পদের চেয়ে ছোট অধিকাংশ দেশের অর্থনীতি

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মাত্র ২০ থেকে ২১টি দেশের অর্থনীতির আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। অর্থাৎ বিশ্বের অধিকাংশ দেশের অর্থনীতিই এখন ইলন মাস্কের সম্পদের চেয়ে ছোট।

তাইওয়ানের অর্থনীতির আকার প্রায় ৯৭৭ বিলিয়ন ডলার, আয়ারল্যান্ডের ৭৭৯ বিলিয়ন ডলার, সুইডেনের ৭৬০ বিলিয়ন ডলার এবং সিঙ্গাপুরের ৬৬০ বিলিয়ন ডলার। এমনকি মাস্কের জন্মভূমি দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতির আকারও প্রায় ৪৮০ বিলিয়ন ডলার, যা তার সম্পদের অর্ধেকেরও কম।

২০২৬ সালের আইএমএফের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণ আফ্রিকার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) দ্বিগুণেরও বেশি মূল্যমানের সম্পদের মালিক এখন মাস্ক।

ম্যানহাটন ও হিউস্টনের চেয়েও বেশি সম্পদ

যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের ২০২৪ সালের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদন ছিল সামান্য বেশি ১ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ একা ইলন মাস্কের সম্পদ প্রায় একটি বৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চলের সমপর্যায়ের।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্থ বৃহত্তম শহর হিউস্টনের সব আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্পত্তির সম্মিলিত মূল্য প্রায় ৮৭৯ বিলিয়ন ডলার, যা মাস্কের সম্পদের তুলনায় অনেক কম।

এক বছরে আমেরিকানদের কেনা সব নতুন গাড়ির চেয়েও বেশি

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে নতুন গাড়ির গড় মূল্য ছিল ৪৮ হাজার ৪০২ ডলার। ২০২৫ সালে দেশটিতে মোট ১ কোটি ৬৩ লাখ নতুন গাড়ি বিক্রি হয়েছে, যার মোট মূল্য প্রায় ৭৮৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ পুরো বছরে আমেরিকানদের কেনা সব নতুন গাড়ির সম্মিলিত মূল্যও মাস্কের সম্পদের তুলনায় কম।

বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের সম্মিলিত সম্পদের কাছাকাছি

ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ছিলেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ, যার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৯৩ বিলিয়ন ডলার। ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা থেকে তিনি এখনও প্রায় ৭০৭ বিলিয়ন ডলার পিছিয়ে। একই সঙ্গে ল্যারি পেজ, সের্গেই ব্রিন, জেফ বেজোস ও ল্যারি এলিসনের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ০৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মাস্কের সম্পদের কাছাকাছি হলেও এখনও কম।

খেলাধুলার সবচেয়ে দামি দলগুলোর মূল্যও অনেক কম

বিশ্বজুড়ে ক্রীড়া দলগুলো ধনকুবেরদের অন্যতম জনপ্রিয় বিনিয়োগ ক্ষেত্র। কিন্তু ১ ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে বিশ্বের প্রায় সব বড় ক্রীড়া দলই কিনে ফেলা সম্ভব।

ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান ৫০টি ক্রীড়া দলের সম্মিলিত মূল্য প্রায় ৩৫৩ বিলিয়ন ডলার। তালিকার শীর্ষে থাকা এনএফএলের ডালাস কাউবয়েজের মূল্য প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার এবং ৫০ নম্বরে থাকা এনবিএর টরন্টো র‌্যাপটরসের মূল্য প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের হাতে পৌঁছাতে পারে ১২২ ডলার। 

মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৮২০ কোটি। ১ ট্রিলিয়ন ডলার সমানভাবে ভাগ করে দিলে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ প্রায় ১২২ ডলার করে পেতে পারে।

চাঁদে ২০০ বারের বেশি যাওয়া-আসার সমান

যদি ১ ট্রিলিয়ন এক ডলারের নোট একটির পর একটি সাজানো হয়, তাহলে সেগুলোর দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৯ কোটি ৭০ লাখ মাইল বা প্রায় ১৫ কোটি ৬০ লাখ কিলোমিটার।

নাসার তথ্য অনুযায়ী পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার ৮৫৫ মাইল। সেই হিসাবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের নোটের সারি পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে ২০০ বারেরও বেশি যাওয়া-আসার সমান দূরত্ব অতিক্রম করবে। এমনকি এই দূরত্ব পৃথিবী থেকে সূর্যের প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ মাইল দূরত্বকেও ছাড়িয়ে যাবে।

২৫ লাখের বেশি বাড়ি কেনা সম্ভব

যুক্তরাষ্ট্রে একটি বাড়ির মধ্যম মূল্য প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার ২০০ ডলার। সেই হিসাবে ১ ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে প্রায় ২৫ লাখ বাড়ি কেনা সম্ভব। ২৪৩ বিলিয়ন গ্যালনের বেশি জ্বালানি কেনা যাবে।

দেশটিতে প্রতি গ্যালন জ্বালানির গড় মূল্য প্রায় ৪ দশমিক ১১ ডলার হিসেবে ১ ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে ২৪৩ বিলিয়নেরও বেশি গ্যালন জ্বালানি কেনা সম্ভব। তুলনামূলকভাবে গত বছর পুরো যুক্তরাষ্ট্রে মোট ১৩৭ বিলিয়ন গ্যালন মোটর গ্যাসোলিন ব্যবহৃত হয়েছিল। তথ্যসূত্র: সিএনএন, বিবিসি, রয়টার্স