Image description

কয়েক দিন আগেই হরমুজ প্রণালির কাছে আমেরিকার একটি অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করে ইরান। এর জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে বিবৃতি দিয়েছেন, তাতে আগের মতো দম্ভ বা আধিপত্যের চেয়ে বরং চরম সতর্কতা ও দুর্বলতাই বেশি প্রকাশ পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঠিক তখনই ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বৈরুতে বোমাবর্ষণ অব্যাহত রাখে ইসরাইল।

এর জবাবে ইরানও মার্কিন হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে ইসরাইলের পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। হোয়াইট হাউসের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যেভাবে ট্রাম্পকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছেন, তাতে মার্কিন ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এখন বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট। আমেরিকার ইতিহাসে ট্রাম্পই প্রথম প্রেসিডেন্ট যিনি ইসরাইলের হয়ে সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ান। অথচ এই যুদ্ধের কারণে দেশের ভেতরে ট্রাম্প তীব্র জনরোষের মুখে পড়েছেন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, ৬০ ভাগ আমেরিকান নাগরিক এখন ইসরাইলের ওপর অসন্তুষ্ট। ফলে ট্রাম্প যুদ্ধটি দ্রুত শেষ করতে মরিয়া। কিন্তু নেতানিয়াহু তার কথা শুনছেন না। কেননা নেতানিয়াহু ভয় পাচ্ছেন যে, ট্রাম্প তেহরানকে অনেক বেশি ছাড় দিয়ে দিচ্ছেন। লেবাননে যুদ্ধবিরতি চলার কথা থাকলেও ইসরাইল হামলা থামায়নি।

গত মার্চে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি বাহিনী ৩,৬০০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছে, যার বেশিরভাগই শিয়া মুসলমান। একই সঙ্গে লেবাননের এক-পঞ্চমাংশ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে দেশের বিশাল এলাকা দখল করে নিয়েছে তারা। ইসরাইলের এই কর্মকাণ্ড মূলত আমেরিকার সঙ্গে ইরানের চুক্তিকে নসাৎ করার একটি সুনির্দিষ্ট চক্রান্ত। কিন্তু আমেরিকার রাজনীতিতে ইহুদি লবি বা ‘আইপ্যাক’-এর বিপুল অর্থায়ন এবং প্রভাবের কারণে ট্রাম্প চাইলেও নেতানিয়াহুকে দমাতে পারছেন না। ইসরাইলকে দেয়া প্রতি বছরের ৩৮০ কোটি ডলারের নিয়মিত সহায়তা ছাড়াও ট্রাম্প সম্প্রতি অতিরিক্ত ৮০০ কোটি এবং ৬৫০ কোটি ডলারের সমরাস্ত্র সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন এই বিপুল অস্ত্র ও অর্থ ছাড়া ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধ চালানো অসম্ভব হলেও, ট্রাম্প চাপ প্রয়োগের এই অস্ত্রটি ব্যবহার করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

ইরানের সাবেক শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির ‘কৌশলগত ধৈর্য’ নীতির দিন শেষ হয়েছে। তার মৃত্যুর পর নতুন নেতা মোজতবা খামেনির অধীনে ইরানি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এখন চরম আক্রমণাত্মক। অন্যদিকে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুসালেমে স্থানান্তর করা, খামেনিকে হত্যার নির্দেশ দেয়া এবং ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বিশ্বাসযোগ্যতা আগেই হারিয়েছিলেন। গাজা যুদ্ধে ৭২ হাজার মানুষের মৃত্যুর পর বিশ্ব আদালত নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলেও ট্রাম্প তাকে সমর্থন দিয়ে গেছেন।

কাতার চুক্তির মাধ্যমে গাজা যুদ্ধ থামানোর নাটক করা হলেও এরপরও সেখানে প্রায় ৯০০ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে, যা আমেরিকার দ্বিচারিতাকেই সামনে আনে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারের অপসারণের মাধ্যমে আমেরিকা যে আধিপত্য দেখিয়েছিল, ইরান যুদ্ধের কারণে তা এখন পুরোপুরি ম্লান হয়ে গিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের এক জরিপে দেখা গেছে, আরবের সাধারণ মানুষ এখন মার্কিন নেতৃত্বের চেয়ে চীন, রাশিয়া ও ইরানকে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখছে। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় রাশিয়ার অর্থনীতি শক্তিশালী হয়েছে, যা তারা ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে আমেরিকা ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে যুদ্ধজাহাজ ও সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেয়ায় সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে চীন। উপসাগরীয় দেশগুলো আমেরিকার ওপর আস্থা হারিয়ে এখন চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা চুক্তি বাড়াতে আগ্রহী। ট্রাম্প এক সময় ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ (মাগা) স্লোগান দিলেও, মধ্যপ্রাচ্যে তার সব ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তিনি মূলত আমেরিকাকে আরও দুর্বল ও হেয় প্রতিপন্ন করে তুলেছেন।

লেখক: নাগেশ কৌশিক, বিবিসি ও এপির সাবেক সম্পাদক

এনডিটিভি