খাড়া পাথুরে পাহাড়ের দিকে একটু দূর থেকে তাকালে প্রথমে কিছুই অস্বাভাবিক মনে হবে না। চারপাশে ঘন সবুজ, পাহাড়ি বাতাস আর নিস্তব্ধতা। কিন্তু একটু ভালো করে দৃষ্টি দিলে কিংবা কাছাকাছি হলে, চোখে পড়বে অদ্ভুত এক দৃশ্য। পাহাড়ের গায়ে সারি সারি ঝুলছে কাঠের কফিন। কোনোটি নতুন, কোনোটি শত বছরেরও বেশি পুরোনো। কোনোটি প্রায় পাথরের সঙ্গে মিশে গেছে। ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি গ্রাম সাগাদায় গেলে এমন দৃশ্যই দেখতে পাবেন। কিন্তু পাহাড়ের শরীরে এসব কফিন আটকে রাখার রহস্য কী?
ফিলিপাইনের সবচেয়ে বড় ও জনবহুল দ্বীপ লুজনের উত্তরে করডিলেরা সেন্ট্রাল পর্বতমালার মধ্যে অবস্থিত ছোট্ট এই জনপদ। রাজধানী ম্যানিলা থেকে সেখানে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে আট ঘণ্টা। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা, খাড়া ঢাল আর অসংখ্য বাঁক পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় সাগাদায়। কিন্তু এই দীর্ঘ যাত্রা পর্যটকদের উৎসাহে ভাটা দেয় না। কারণ পৃথিবীর অন্যতম অদ্ভুত সমাধি প্রথার সাক্ষী হতে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ সেখানে ছুটে আসেন।
সাগাদায় বসবাসকারী ইগোরোট জনগোষ্ঠী প্রায় দুই হাজার বছর ধরে পালন করে আসছে এক বিস্ময়কর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া। তাদের বিশ্বাস, মৃত মানুষকে মাটির নিচে সমাহিত না করে পাহাড়ের গায়ে ঝুলিয়ে রাখাই সবচেয়ে সম্মানজনক বিদায়। এ কারণেই মৃত্যুর পর মৃতদেহ কাঠের কফিনে রেখে খাড়া পাহাড়ের দেয়ালে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। কখনো দড়ি দিয়ে বেঁধে, কখনো বিশাল লোহার পেরেক ঠুকে কফিনগুলো আটকে দেওয়া হয় পাথরের গায়ে। ফলে মাটি থেকে অনেক ওপরে, মানুষের নাগালের বাইরে ঝুলতে থাকে মৃতদের শেষ আশ্রয়।
কফিনগুলোর কোনোটি নতুন, কোনোটি শত বছরেরও বেশি পুরোনো
এই প্রথার পেছনে রয়েছে গভীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিশ্বাস। ইগোরোটদের ধারণা, পাহাড়ের উঁচুতে অবস্থান করলে মৃতদের আত্মা পূর্বপুরুষদের আরও কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। একই সঙ্গে আকাশের যত কাছে থাকা যাবে, পরবর্তী জীবনে আত্মার অবস্থানও তত উন্নত হবে। তাই পাহাড়ের যত উঁচু স্থানে কফিন ঝোলানো যায়, ততই তা মর্যাদার বলে বিবেচিত হয়।
তবে সবাই এই সম্মান পেতেন না। গবেষকদের মতে, অতীতে সাধারণত সমাজের প্রবীণ, সম্মানিত বা বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্যই ঝুলন্ত কফিনের ব্যবস্থা করা হতো। শিশু বা অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের ক্ষেত্রে অনেক সময় অন্য ধরনের সমাধি দেওয়া হতো। এই রীতির আরেকটি বাস্তব কারণও ছিল। এর ফলে পাহাড়ি অঞ্চলে বন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে মৃতদেহ রক্ষা করা সহজ হতো। পাশাপাশি বর্ষাকালে ভূমিধস বা বন্যার কারণে সমাধি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও থাকত না।
সাগাদার ঝুলন্ত কফিনগুলোর মধ্যে কিছু কফিনের বয়স শত বছরেরও বেশি। আবহাওয়া, বৃষ্টি, রোদ আর বাতাসের প্রভাবে অনেক কফিন ভেঙে পড়েছে। আবার কিছু এখনো পাহাড়ের গায়ে ঝুলছে বিস্ময়করভাবে। আরও অবাক করার মতো বিষয় হলো, ইগোরোটদের অনেকেই জীবদ্দশায় নিজেদের কফিন নিজেরাই তৈরি করেন। বয়স বাড়লে কাঠ সংগ্রহ করে নিজের হাতে কফিন বানানো শুরু করেন তাঁরা। অনেক সময় কফিনের গায়ে নিজের নামও লিখে রাখেন। কারণ তাঁদের বিশ্বাস, মৃত্যুর প্রস্তুতিও জীবনেরই একটি অংশ।
অনেক দূর থেকেও পর্যটকেরা হাজির হন ঝুলনস্ত কফিন দেখতে
মৃত্যুর পর কফিনে তোলার আগেও পালন করা হয় বেশ কয়েকটি বিশেষ আচার। প্রথমে মৃতদেহকে একটি কাঠের বিশেষ চেয়ারে বসানো হয়। স্থানীয়ভাবে একে বলা হয় ‘মৃত্যুচেয়ার’। এরপর লতা বা বেতজাতীয় উদ্ভিদ দিয়ে মৃতদেহটিকে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। মাথা সামান্য নিচু করে বসানো হয় এমনভাবে, যেন মৃত ব্যক্তি ধ্যানমগ্ন অবস্থায় আছেন। এরপর মৃতদেহ একটি কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়। কয়েক দিন ধরে আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা এসে শেষ শ্রদ্ধা জানান। এ সময় মৃতদেহ দ্রুত পচন থেকে রক্ষা করতে ধোঁয়ার সাহায্যে সংরক্ষণ করা হয়। আগুনের ধোঁয়া মৃতদেহকে অনেকটা শুকিয়ে দেয়, ফলে দুর্গন্ধ ছড়ানোর সম্ভাবনা কমে যায়। সব আচার শেষ হলে শুরু হয় সবচেয়ে কঠিন কাজ। মৃতদেহকে কফিনে ঢোকানো।
একসময় ইগোরোটদের কফিন ছিল মাত্র এক মিটার বা প্রায় তিন ফুট লম্বা। কারণ তারা বিশ্বাস করত, মানুষকে পৃথিবী থেকে বিদায় জানানো উচিত সেই ভঙ্গিতে, যেভাবে সে মায়ের গর্ভে ছিল। এই কারণে মৃতদেহকে ভ্রূণের মতো কুঁকড়ে রাখা হতো। অনেক ক্ষেত্রে হাত-পা ভাঁজ করতে গিয়ে হাড়গোড় ভেঙে ফেলতেও হতো। বর্তমান সময়ে এ ধরনের প্রথা প্রায় বিলুপ্ত। এখন বড় আকারের কফিন ব্যবহার করা হয় এবং মৃতদেহ স্বাভাবিক অবস্থায় রাখা হয়।
স্থানীয় গাইড বানগিয়া বলেন, ‘এটা অনেকটা মানুষকে তার শুরুর অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়ার মতো।’
একসময় ইগোরোটদের কফিন ছিল মাত্র এক মিটার বা প্রায় তিন ফুট লম্বা
কফিন প্রস্তুত হলে মৃতদেহকে সাধারণত রত্তন বা অন্য কোনো উদ্ভিদের পাতা দিয়ে ঢেকে কফিনে রাখা হয়। এরপর কয়েকজন মিলে বিপজ্জনক পাহাড়ি দেয়ালে উঠে কফিনটি স্থাপন করেন। বড় বড় পেরেক দিয়ে সেটি পাথরের গায়ে আটকে দেওয়া হয়। এভাবেই ঝুলন্ত গোরস্থানে যুক্ত হয় নতুন একটি কফিন।
তবে পৃথিবীতে সাগাদাই একমাত্র জায়গা নয় যেখানে এমন প্রথা ছিল। চীনের সিচুয়ান ও ইউনান অঞ্চলের কিছু প্রাচীন জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে বো জনগণ, শত শত বছর আগে পাহাড়ের গায়ে কফিন ঝুলিয়ে রাখত। ইন্দোনেশিয়ার সুলাওয়েসি দ্বীপের তোরাজা জনগোষ্ঠীর মধ্যেও অনুরূপ রীতি ছিল। কিন্তু এসব অঞ্চলে প্রথাগুলো প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
সাগাদা ব্যতিক্রম। এখানে এখনো ঐতিহ্যটি পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। যদিও আগের তুলনায় ঝুলন্ত কফিনের সংখ্যা কমেছে, তবু সাম্প্রতিক বছরগুলোতেও কয়েকজনকে ঐতিহ্যগত নিয়মে পাহাড়ের গায়ে সমাহিত করা হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই আধুনিক সমাধি পদ্ধতি বেছে নিচ্ছেন, কিন্তু কেউ কেউ এখনো পূর্বপুরুষদের রীতিই অনুসরণ করতে চান।
একসময় এই আচার বাইরের বিশ্বের কাছে প্রায় অজানাই ছিল। দুর্গম পাহাড়ের মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করত ইগোরোটরা। কিন্তু যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হওয়ার পর সাগাদার ঝুলন্ত কফিন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। এখন এটি ফিলিপাইনের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন আকর্ষণ।
স্থানীয়রা চান, পর্যটকেরা যেন কফিনগুলোকে নিছক দর্শনীয় বস্তু হিসেবে না দেখেনপ্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক পাহাড়ি পথ ধরে হেঁটে কফিনগুলো দেখতে যান। স্থানীয় বাসিন্দারা গাইড হিসেবে কাজ করেন। তাঁরা শুধু ঝুলন্ত কফিনই দেখান না, নিজেদের ইতিহাস, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির গল্পও শোনান। ফলে পর্যটনের মাধ্যমে আর্থিকভাবেও লাভবান হচ্ছেন তারা। তবে এই জনপ্রিয়তার মাঝেও স্থানীয়দের একটি অনুরোধ আছে। তারা চায়, পর্যটকেরা যেন কফিনগুলোকে নিছক দর্শনীয় বস্তু হিসেবে না দেখে। কারণ এগুলো কোনো জাদুঘরের প্রদর্শনী নয়। এগুলো তাদের পূর্বপুরুষদের সমাধি।
সাগাদার পাহাড়ের গায়ে ঝুলে থাকা প্রতিটি কফিন দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে থাকা এক বিশ্বাসের প্রতীক। যেখানে মৃত্যুকে পূর্বপুরুষদের কাছে ফিরে যাওয়ার আরেকটি যাত্রা হিসেবে দেখা হয়। আর সেই কারণেই আজও ফিলিপাইনের একটি দূরবর্তী পাহাড়ি গ্রামে, মেঘের ছায়ার নিচে, পাথুরে দেয়ালে ঝুলে আছে শত শত কফিন নিঃশব্দে বলে যাচ্ছে বহু প্রজন্মের গল্প।
সূত্র: বিবিসি ট্রাভেল, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, অ্যাটলাস অবস্কিউরা, রিপ্লিস বিলিভ ইট অর নট