পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাতে তিনটি অত্যাধুনিক রাফায়েল যুদ্ধবিমান হারিয়েছিল ভারত। ফ্রান্সের তৈরি এই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত বা ধ্বংস হওয়ার পর পরই এর সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয় প্রশ্ন। দ্রুত ধস নামে যুদ্ধবিমানের দরদামে।
ওই সংঘাতের বছর পেরোতেই ফ্রান্স থেকে আরও ১১৪টি রাফায়েল যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা এগোচ্ছে নয়াদিল্লি। আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাব পাঠানোও হয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে চূড়ান্ত হতে পারে চুক্তি।
মঙ্গলবার (২ জুন) এনডিটিভি জানিয়েছে, ভারতের বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল অমর প্রীত সিং চার দিনের সফরে ফ্রান্সে রয়েছেন। তার এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন ভারত ১১৪টি নতুন রাফায়েল যুদ্ধবিমান সংগ্রহের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এটি ভারতীয় বিমানবাহিনীর ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম যুদ্ধবিমান সংগ্রহের পরিকল্পনা।
ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নয়াদিল্লি রাফায়েল যুদ্ধবিমান কেনার জন্য ফ্রান্সকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠিয়েছে। ফ্রান্স এখন মূল্য, উৎপাদন ক্ষমতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে এর জবাব দেবে।
আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে এই জবাব আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপর দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে। কর্মকর্তারা মনে করছেন, আগামী এক বছরের মধ্যেই এই চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে।
বিমানবাহিনী প্রধানের সফর কেন গুরুত্বপূর্ণ
বিমানবাহিনী প্রধানের এই সফরকে কেবল আনুষ্ঠানিক হিসেবে দেখা হচ্ছে না। আশা করা হচ্ছে, তিনি ফ্রান্সের প্রধান প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এদের মধ্যে রয়েছে রাফায়েল যুদ্ধবিমানের নির্মাতা দাসো এভিয়েশন এবং মেটিওর ও স্ক্যাল্পের মতো অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুতকারী এমবিডিএ।
ধারণা করা হচ্ছে, এই আলোচনা শুধু বিমান কেনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। আলোচনায় ভারতে উৎপাদন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং ভারতীয় অস্ত্রের সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলোও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী মোদিও ফ্রান্স সফরের সম্ভাবনা
সূত্রমতে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চলতি জুনের মাঝামাঝি সময়ে ইউরোপের দেশ ফ্রান্স সফর করতে পারেন। এই সফর হলে রাফায়েল চুক্তি অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হতে পারে।
চুক্তিটি জি২জি (সরকার-থেকে-সরকার) মডেলে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাই, উভয় দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ভারতের কেন নতুন যুদ্ধবিমান প্রয়োজন
ভারতীয় বিমানবাহিনীর অনুমোদিত স্কোয়াড্রনের সংখ্যা ৪২টি। কিন্তু বর্তমানে তাদের রয়েছে মাত্র ২৯টি স্কোয়াড্রন। মিগ-২১-এর মতো পুরোনো বিমানগুলো পর্যায়ক্রমে বাদ দেওয়ার পর এই ঘাটতি আরও বেড়েছে।
এই কারণেই ১১৪টি নতুন মাল্টিরোল ফাইটারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই প্রতিযোগিতায় রাফায়েলকে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিমানবাহিনী ইতোমধ্যেই ৩৬টি রাফায়েল জেট পরিচালনা করছে।
ভারতেই যুদ্ধবিমান তৈরির পরিকল্পনা
এই প্রস্তাবিত চুক্তির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ভারতে এই বিমানগুলোর উৎপাদন। সূত্রমতে, ১১৪টি যুদ্ধবিমানের মধ্যে ৯৪টি ভারতে তৈরি হতে পারে। বাকি বিমানগুলো সরাসরি ফ্রান্স থেকে আসবে। এর জন্য ডাসল্ট এভিয়েশন একটি ভারতীয় সংস্থার সঙ্গে অংশীদার হতে পারে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই প্রকল্পে প্রায় ৫০ শতাংশ স্থানীয়করণ চায়। এর মানে হলো, বেশ কিছু ভারতীয় সিস্টেম এবং অস্ত্রশস্ত্র এই বিমানগুলোতে যুক্ত করা যেতে পারে। এটিকে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের জন্য একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারত-ফ্রান্স রাফায়েল সহযোগিতা নতুন নয়। ২০১৬ সালে, দুই দেশ ৩৬টি রাফায়েল যুদ্ধবিমানের জন্য একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। সেই সব বিমানের সরবরাহ সম্পন্ন হয়েছে। এগুলো আম্বালা ও হাসিমারা বিমান ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, বিদ্যমান অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষিত পাইলটরা নতুন রাফায়েলগুলোর অন্তর্ভুক্তি সহজতর করবে।