Image description

ফিলিস্তিনি বন্দিদের ওপর ইসরায়েলের নির্মম নির্যাতন নতুন কিছু নয়। তাদের নির্যাতনের মধ্যে ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার মতো ঘটনা রয়েছে। সাম্প্রতিক এমন ঘটনায় বিশ্ববাসী আবারও ফিলিস্তিনিদের ওপর চলা ইসরায়েলি ঔপনিবেশিক আগ্রাসনের এক ভয়াবহ চিত্র দেখেছে। সামান্যতম মানবিকতাবোধ আছে এমন যেকোনো ব্যক্তি ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীদের ওপর চলা এই নির্যাতনের বিবরণ শুনে স্তব্ধ, ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত হবেন। সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষ কল্পনাই করতে পারে না যে, কীভাবে একজন মানুষের ওপর এমন জঘন্য ও পাশবিক নির্যাতন চালাতে পারে।

 

কিন্তু নির্মম সত্য হলো, ইসরায়েলি কারাগারগুলোতে যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ এবং মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের এই ভয়াবহ রূপ আমরা এবারই প্রথম শুনছি এমন নয়। গবেষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো দশকের পর দশক ধরে এই ধরনের নৃশংসতার প্রমাণ সংগ্রহ করে আসছে।

 

২০২৩ সালের অক্টোবরের আগেই গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, ২০১০ সালের পর থেকে ফিলিস্তিনি বন্দিদের জন্য ইসরায়েলি কারাগারের ভেতরের পরিস্থিতি কতটা শোচনীয় হয়ে উঠেছে। আর গত আড়াই বছরে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।

 

এই সময়ে আমরা ইসরায়েলি সহিংসতার আরেকটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক দিক লক্ষ্য করেছি- যা শুধু কক্ষের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নয়, বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। তা হলো, এই সহিংসতা করার সময় তাদের ভেতরের এক অদ্ভুত আনন্দ ও উল্লাস।

 

ফিলিস্তিনি বন্দিদের বিবরণ পড়লে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, ইসরায়েলি প্রহরীরা কেবল নিয়মিত নির্যাতনই করছে না, বরং হাসতে হাসতে এই বর্বরতা চালাচ্ছে। একের পর এক বন্দি তাদের জবানবন্দিতে প্রহরীদের এই হাসির কথা উল্লেখ করেছেন।

 

বিষয়টি একটি বড় প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে- যা সাধারণত এড়িয়ে যাওয়া হয়: কোন ধরনের মানুষ এই ধরনের নির্যাতনকে আনন্দ ও উপভোগের উৎস মনে করতে পারে? কী ধরনের মানসিকতা থাকলে নির্যাতনের মতো একটি কাজের সময় একজন মানুষ হাসতে পারে? এই প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব আরও বেশি ভয়াবহ হয়ে ওঠে যখন আমরা দেখি যে, এই নির্বিচার সহিংসতার সময় হাসাহাসি করার প্রবণতা কেবল কারাগারেই সীমাবদ্ধ নয়।

 

গত আড়াই বছর ধরে চলা গণহত্যার সময়ে আমরা দেখেছি, ডজন ডজন ইসরায়েলি সেনা ফিলিস্তিনিদের ঘরবাড়ি ও পুরো এলাকা ধ্বংস করা, শিশুসহ বেসামরিক মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা, নিহত বা জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়া মানুষদের সম্পদ চুরি করা এবং নির্দোষ ফিলিস্তিনিদের পঙ্গু করে দেওয়ার মতো অপরাধগুলো ক্যামেরায় ধারণ করছে। শুধু তাই নয়, এসব করার সময় তাদের মুখে স্পষ্ট আনন্দের ছাপ দেখা গেছে।

 

আল জাজিরার একটি বিশেষ দল এই ধরনের কিছু ভিডিওর একটি তালিকা তৈরি করেছে। সেখানে দেখা যায়, একজন ফরাসি-ইসরায়েলি সেনা একজন বন্দির দিকে ইশারা করে গর্বের সাথে বলছে, ‘দেখো, ও ভয়ে প্রস্রাব করে দিয়েছে। দেখো, আমি ওর পিঠ দেখাচ্ছি। তোমরা হাসবে এটা দেখলে। দেখো, কথা বলানোর জন্য ওকে নির্যাতন করা হয়েছে। ওর পিঠ দেখেছ? বেশ্যার ছেলে।’

 

এই সেনা কেন এত নিশ্চিত যে ভিডিওটি দেখলে মানুষ হাসবে? এখানেই আমাদের একটি ভয়াবহ সত্যের মুখোমুখি হতে হয়- ফিলিস্তিনিদের জীবন ধ্বংসকারী, খুনি ও নির্যাতনকারীদের এই পাশবিক উল্লাসকে ইসরায়েলি সমাজ পুরস্কৃত করছে। তাদের এই ভিডিওগুলো ইসরায়েলি সমাজে বেশ প্রশংসিত হচ্ছে। এমনকি ইসরায়েলের মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলোও এই গণহত্যা উদযাপনে এবং তা আরও জোরদার করার আহ্বানে মেতে উঠেছে। এই ঘটনাগুলো ইসরায়েলি সমাজ সম্পর্কে আমাদের কী বার্তা দেয়?

 

কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলি প্রচারণায় একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, ফিলিস্তিনিদের হত্যা, নির্যাতন বা বাস্তুচ্যুত করাকে ইসরায়েলিরা দুঃখজনক কিন্তু ‘অনিবার্য’ মনে করে।

 

ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মেয়ারের একটি বিখ্যাত উক্তি এর বড় উদাহরণ- ‘আমাদের সন্তানদের হত্যা করার জন্য আমরা আরবদের ক্ষমা করতে পারি। কিন্তু আমাদের সন্তানদের হাত দিয়ে তাদের সন্তানদের হত্যা করতে বাধ্য করার জন্য আমরা তাদের কখনই ক্ষমা করতে পারি না।’

 

এরপর থেকে এই চিন্তাভাবনা ইসরায়েলের প্রচারণার একটি প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে, যাকে বলা হতো ‘শুটিং অ্যান্ড ক্রায়িং’ বা ‘কাঁদতে কাঁদতে গুলি করা’।

 

দ্বিতীয় ইন্তিফাদার পর এবং বিশেষ করে ২০০৭ সালে গাজায় অমানবিক অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে, ইসরায়েলি সমাজ থেকে এই ‘কাঁদতে কাঁদতে গুলি করার’ নাটকটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে।

 

ইসরায়েলিদের গণমাধ্যম ও আলোচনায় ফিলিস্তিনিদের ওপর করা সহিংসতার মানসিক প্রভাব নিয়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায়। এর পরিবর্তে, তারা উদযাপন করতে শুরু করে যে তাদের সেনারা কত দক্ষতার সাথে ফিলিস্তিনিদের হত্যা ও ধ্বংস করতে পারছে।

 

গাজা অবরোধের ফলে কত ফিলিস্তিনি মারা যাবে তা অনুমান করে, এই অবরোধের অন্যতম পরিকল্পনাকারী এবং গবেষক আরনন সোফার ২০০৪ সালেই বলেছিলেন, ‘সীমান্তে চাপ হবে ভয়াবহ। এটি একটি ভয়াবহ যুদ্ধ হতে যাচ্ছে। তাই, আমরা যদি বেঁচে থাকতে চাই, তবে আমাদের হত্যা করতে হবে, হত্যা করতে হবে এবং হত্যা করতে হবে। সারাদিন, প্রতিদিন।’

 

যদিও সোফার তখন উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে, যেসব তরুণেরা এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেবে তারা স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে পরিবারে ফিরতে পারবে কি না; কিন্তু ততক্ষণে ইসরায়েলের সমাজ ভিন্ন রূপ নিয়ে নিয়েছে।

 

ইসরায়েলি সমাজ নিজেদের সেনাদের মানসিক অবস্থার চেয়ে ফিলিস্তিনিদের হত্যার ওপর বেশি জোর দিতে শুরু করে। ফিলিস্তিনিদের লাশের সংখ্যা ইসরায়েলি সমাজের কাছে আনন্দের খবর হিসেবে গণ্য হতে থাকে। আজ, গুলি করার সময় কাঁদার সেই ভন্ডামি পুরোপুরি দূর হয়ে গেছে, তার জায়গা নিয়েছে গুলি করার সময় আনন্দের উল্লাস।

 

এই সহিংস উল্লাস কিন্তু কেবল ইসরায়েলি জাতীয়তা বা ইহুদি ধর্মের কারণে তৈরি হয়নি। বরং এটি একটি রাষ্ট্র এবং সমাজের ভেতর জেঁকে বসা ঔপনিবেশিক সহিংসতা ও বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গির স্বাভাবিক পরিণতি। এই ধরনের ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা মানুষের ভেতরের সবচেয়ে খারাপ দিকটিকে বের করে আনে এবং তাদের চরমপন্থী করে তোলে।

একটি ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে দুটি বিষয় প্রধান হয়ে ওঠে। প্রথমত, সেই ভূমির মূল অধিবাসীদের (ফিলিস্তিনিদের) সম্পূর্ণভাবে ‘অমানুষ’ হিসেবে গণ্য করা, যাতে তাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলা সহজ হয়। এই ধরনের মানসিকতা ফিলিস্তিনিদের ওপর যেকোনো সহিংসতা চালানোর নৈতিক বাধা দূর করে দেয়।

 

একই সময়ে, এটি ইসরায়েলিদের মনে এক ধরণের চরম শ্রেষ্ঠত্ববোধ তৈরি করে। একজন ফিলিস্তিনিকে যেমন ময়লা-আবর্জনার মতো মনে করা হয় যা অনায়াসে ফেলে দেওয়া যায়, তেমনি একজন ইসরায়েলি নিজেকে আইনের ঊর্ধ্বে এবং সাধারণ মানবিক নিয়মের বাইরের কোনো অতিমানবীয় সত্তা মনে করতে শুরু করে।

 

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, প্রতিটি সহিংসতার পর যখন তারা কোনো শাস্তি ছাড়াই ফিলিস্তিনিদের আরও জমি দখল করতে পারে, তখন তারা সহিংসতাকে একটি লাভজনক কাজ হিসেবে দেখতে শুরু করে। সহিংসতা তখন আর কোনো ‘দুঃখজনক বাধ্যবাধকতা’ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে পুরস্কার, স্বীকৃতি ও সমর্থন পাওয়ার মাধ্যম। আর এ থেকেই জন্ম নেয় সহিংসতার সময় উল্লাস করার মানসিকতা।

 

যে সমাজ মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্যতম নির্যাতনকে এভাবে উল্লাসের সাথে উদযাপন করে, সেই সমাজের ভেতর থেকে কোনো সংস্কার বা পরিবর্তনের আশা করা যায় না। এই সমাজ নিজে থেকে ভালো হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। এর একমাত্র সমাধান হলো, এই সহিংসতার মাধ্যমে তারা যে সুবিধা পাচ্ছে তা বন্ধ করা।

 

আজ ইসরায়েল ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও লেবাননের অংশবিশেষ দখল করে অস্ত্র বিক্রি, ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো শক্তিশালী অঞ্চলের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং পশ্চিমা দেশগুলোর রাজনৈতিক সমর্থন উপভোগ করছে।

 

এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া দরকার। পুরস্কার দেওয়ার বদলে ইসরায়েলকে তার এই ঔপনিবেশিক সহিংসতার জন্য কঠোর শাস্তি দিতে হবে। আর তার প্রথম পদক্ষেপ হলো ইসরায়েল রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ বয়কট ও বিচ্ছিন্ন করা। যখন ইসরায়েলিরা বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে, কেবল তখনই তারা বুঝতে বাধ্য হবে যে গণহত্যা ও সহিংসতা উদযাপনের বিষয় নয়, বরং এটি একটি জঘন্য অপরাধ। বিশ্ব যদি ইসরায়েলকে এই ন্যূনতম নৈতিকতা মানতে বাধ্য না করে, তবে ইসরায়েলি সমাজের এই লজ্জার দায় বিশ্বের সমস্ত দেশের ওপরও বর্তাবে, যারা ইসরায়েলের এই সহিংস উল্লাসকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

 


লেখক: মুহান্নাদ আইয়াশ ফিলিস্তিন-ইসরায়েল বিষয়ক গবেষক ও বিশ্লেষক। তিনি জেরুজালেমের সিলওয়ানে জন্মগ্রহণ করেন এবং বর্তমানে কানাডার মাউন্ট রয়্যাল ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক।

 

-মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা থেকে অনূদিত।