ভারতের রাজনীতিতে হঠাৎ করেই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে এক অদ্ভুত নাম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সংক্ষেপে ‘সিজেপি’। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ইনস্টাগ্রামে দলটির অনুসারী সংখ্যা পৌঁছে গেছে প্রায় এক কোটির কাছাকাছি। এমনকি অনুসারীর সংখ্যায় তারা টক্কর দিচ্ছে দেশটির ক্ষমতাসীনদল বিজেপিকেও।
মূলত বেকার তরুণ-তরুণীদের ক্ষোভ আর রাজনৈতিক ব্যঙ্গকে কেন্দ্র করেই জন্ম হয়েছে এই ভার্চুয়াল দলের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন এখন রীতিমতো আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে ভারতজুড়ে।
ঘটনার সূত্রপাত ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের একটি মন্তব্যকে ঘিরে। এক শুনানিতে তিনি বলেন, কিছু বেকার তরুণ ‘ককরোচের মতো’ আচরণ করেন। যারা কোনো পেশায় প্রতিষ্ঠিত হতে না পেরে সামাজিকমাধ্যমে বা তথাকথিত অ্যাক্টিভিজমের নামে অন্যদের আক্রমণ করেন। যদিও পরে তিনি দাবি করেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তবে সেই মন্তব্য ঘিরেই অনলাইনে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই ক্ষোভ থেকেই আত্মপ্রকাশ করে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক এবং অলস দল হিসেবে পরিচয় দিয়েছে তারা।
দলের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রেও রয়েছে ব্যতিক্রমী শর্ত। বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা এবং পেশাগত হতাশা প্রকাশের সক্ষমতা থাকলেই মিলবে সদস্যপদ। শুরু হওয়ার প্রথম দুদিনেই ৪০ হাজারের বেশি মানুষ সদস্য হিসেবে নাম লেখান। এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে জনপ্রিয়তা।
ইতোমধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ মহুয়া মৈত্র, কীর্তি আজাদ, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদবসহ কয়েকজন পরিচিত মুখও এই দলকে অনুসরণ করছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে। তিনি একসময় আম আদমি পার্টির সমাজমাধ্যম টিমে কাজ করেছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়নরত এই তরুণই মূলত ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনটিকে সংগঠিত করছেন।
সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ বলেন, আমি এক সপ্তাহ আগে একটা চাকরির জন্য আবেদন করছিলাম, আর তার পরেই এই ঘটনাটি ঘটল। আমি সেই ককরোচ, যার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু লাখো তরুণের ক্ষোভই এখন এই আন্দোলনের শক্তি।
সিজেপি কি ক্ষণস্থায়ী প্রতিবাদ এবং সামাজিকমাধ্যমের একটি ট্রেন্ড হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকবে; এমন প্রশ্নের উত্তরে অভিজিৎ বলেছেন, হ্যাঁ, এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ এবং আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। যারা নাম নথিভুক্ত করেছেন সদস্য হিসাবে তাদের সকলের কাছে পৌঁছোনো এবং তাদের কথা শোনা আমাদের লক্ষ্য। কারণ, আমি সবচেয়ে বড় যে অভিযোগটি পেয়ে আসছি তা হল, কেউ বেকারদের কথা শোনেন না, কেউ তাদের সঙ্গে কথা বলে না এবং তাদের অস্তিত্বকেও স্বীকার করে না। আর এখন তাঁদের ককরোচ এবং পরজীবীর সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। বর্তমান ব্যবস্থা যেভাবে তাদের পুরোপুরি উপেক্ষা করছে, তাতে তারা সত্যিই খুব হতাশ।
দলের ঘোষণাপত্রেও রয়েছে বেশ কিছু রাজনৈতিক দাবি। এর মধ্যে রয়েছে, প্রধান বিচারপতিদের অবসর-পরবর্তী রাজ্যসভা নিষিদ্ধ করা, সংসদে নারীদের জন্য ৫০ শতাংশ সংরক্ষণ এবং দলবদলকারী জনপ্রতিনিধিদের দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচনী নিষেধাজ্ঞা।
এছাড়া শিক্ষাব্যবস্থা, বেকারত্ব এবং তরুণদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়েও সরব হয়েছে সিজেপি।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো ভারতেও ‘জেন জি’ প্রজন্মের হতাশা জমতে শুরু করেছে। আর সেই ক্ষোভেরই ডিজিটাল প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’।
যদিও এটি শেষ পর্যন্ত বাস্তব রাজনৈতিক দলে রূপ নেবে, নাকি শুধুই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যঙ্গ আন্দোলন হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে; তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ভারতের তরুণদের একাংশ যে প্রচলিত রাজনীতিতে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না, সিজেপির উত্থান যেন সেই বার্তাই আরও জোরালো করে তুলছে।
সূত্র : বিবিসি ও আনন্দবাজার পত্রিকা