জেরুজালেমের একটি ক্যাফেতে ল্যাপটপ নিয়ে কাজ করছিলেন ঔপন্যাসিক অ্যালেক্স সিনক্লেয়ার। মাথায় ছিল তার বিশেষ একটি ‘কিপাহ’, যাতে শোভা পাচ্ছিলো ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয় দেশের পতাকা। কিন্তু এই টুপিই যেন এক অশান্তির সূচনা। এক ধর্মীয় ব্যক্তি এসে চিৎকার করে বলেন, এটা পরা আইনবিরুদ্ধ। পুলিশ ডাকার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই হাজির হন দুই কর্মকর্তা। তাদের একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তা ওই কিপাহকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে সিনক্লেয়ারকে আটকের হুমকি দেন।
সিনক্লেয়ার জানান, আইন মেনেই তিনি কিপাহটি সমর্পণ করেন। পুলিশ তার ল্যাপটপ, ফোনসহ সবকিছু কেড়ে নিয়ে তাকে থানায় একটি সেলে বন্দি করে। ২০ মিনিট পর কিপাহ বাদে সব ফিরিয়ে দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সিনক্লেয়ার কিপাহ ছাড়া যেতে অস্বীকৃতি জানালে এক মিনিট পর পুলিশ কর্মকর্তা তা ফিরিয়ে দেন, তবে তাতে ফিলিস্তিনি পতাকার অংশটি কেটে আলাদা করে ফেলা হয়েছিল।
সিনক্লেয়ার অভিযোগ করেছেন, ‘অবৈধ আটক ও সম্পত্তি ধ্বংসের জন্য আমি পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্ত ইউনিটের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছি। তবে আমি খুব একটা আশাবাদী নই।’ তিনি কিপাহটির আগের ও পরের ছবি অনলাইনে পোস্ট করলে তা ইসরায়েলি গণমাধ্যমের সঙ্গে সঙ্গে সিএনএন এবং বিবিসিতেও ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। তিনি বলেন, ‘আমি এই পরিবর্তনের অনুঘটক হতে পেরে খুশি, তবে অপরাধবোধও কাজ করছে যে, একটি সামান্য বিষয় এত মনোযোগ পাচ্ছে, অথচ আমরা বেন-গভিরের পুলিশের আরও অনেক উদ্বেগজনক ঘটনা উপেক্ষা করছি।’
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের ভেতরেই যুদ্ধে লিপ্ত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সিনক্লেয়ারের এই কিপাহটি যেন এক জীবন্ত প্রতীক, যা ফিলিস্তিন-বিরোধী গোঁড়ামি, পুলিশের রাজনৈতিকীকরণ, আদালতের অবমাননা এবং ভিন্নমতাবলম্বী ইহুদিদের দমনের। নেতানিয়াহু এমন একটি ভিত্তি তৈরি করছেন যাতে সরকার পরবর্তী নির্বাচনে জয়ী না হলেও সেই নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ তৈরি করা যায়।
দ্য জেরুজালেম রিপোর্ট-এর অবসরপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিরশ গুডম্যান বলেন, ‘বিবি (নেতানিয়াহু) ২০২২ সালে বেন-গভিরকে পুলিশের দায়িত্বে বসিয়েছেন এবং অতি সম্প্রতি শিন বেতের কমান্ডে একজন উগ্র সেটেলারকে যুক্ত করেছেন।’ তার মতে, সরকার সুপ্রিম কোর্ট এবং অ্যাটর্নি জেনারেলের ওপর অজস্র আক্রমণ চালিয়ে তাদের কোণঠাসা করছে।
ইসরায়েল ডেমোক্র্যাসি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ইয়োহানান প্লেসনার জানান, নেতানিয়াহুর সরকার বিচার বিভাগ এবং বেসামরিক প্রশাসনকে দুর্বল করতে প্রায় ৮০টি উদ্যোগ চিহ্নিত করেছে। অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারেভ-মিয়ারা সুপ্রিম কোর্টে ৬৮ পৃষ্ঠার পিটিশন দায়ের করে বেন-গভিরকে বরখাস্তের দাবি জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, বেন-গভির পুলিশ বাহিনীকে চরমপন্থি মতাদর্শের দিকে ঠেলে দিতে ‘চাপের ব্যবস্থা’ প্রয়োগ করেছেন।
এদিকে, বেন-গভিরের দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসরায়েলি আরব শহরগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই শিথিল যে ৭০০-এর বেশি নাগরিক খুন হয়েছেন। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেসেট সদস্য গিলাদ কারিভ বলেন, ‘এটি কোনও ব্যর্থতা নয়, এটি একটি সুপরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবহেলা।’
গত ১৫ এপ্রিল অ্যাটর্নি জেনারেলের পিটিশন সুপ্রিম কোর্টে এলে সরকারের আইনজীবী ডেভিড পিটার গ্রীক পুরাণের শিকারী ‘অ্যাক্টিয়ন’-এর উদাহরণ টেনে আদালতকে পরোক্ষ হুমকি দেন। আদালত অবশ্য চূড়ান্ত রায় দেয়নি, বরং সমঝোতার নির্দেশ দিয়েছে।
প্লেসনার সতর্ক করে বলেন, ‘সাধারণ পুলিশের পেশাদারত্বের ওপর কিছু আস্থা থাকলেও, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈধতা নষ্ট করার প্রক্রিয়া আমাকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। আসল বিপদ হলো, নির্বাচনের পর মানুষ যখন বলবে, এই ফলাফল সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ চায়নি, চেয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।’
সিনক্লেয়ারের কিপাহর মতোই, মূল উদ্দেশ্য হলো ফিলিস্তিনিদের বাদ দেওয়া, যা ইসরায়েলি গণতন্ত্রের পক্ষে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সূত্র: নিউ ইয়র্কার