Image description

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদের নির্বাচন ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নীরব প্রতিযোগিতা। এ পদে প্রার্থী বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস।

বৈশ্বিক কূটনৈতিক মহলে এখন বড় প্রশ্ন– কে এগিয়ে, শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে জুটতে পারে এই মর্যাদাপূর্ণ পদ? জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনের সভাপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং সাইপ্রাসের জাতিসংঘে নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত আন্দ্রেয়াস এস. কাকোরিস।

 

কেন গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদটি মূলত কূটনৈতিক নেতৃত্ব, বৈশ্বিক ঐকমত্য গঠন এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে মধ্যস্থতামূলক ভূমিকার প্রতীক।

প্রতিবছর আঞ্চলিক রোটেশনের ভিত্তিতে এ পদে নির্বাচন হয়। ৮১তম অধিবেশনের জন্য পালা এসেছে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের।
সাধারণত আঞ্চলিক গ্রুপের অভ্যন্তরে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়। তবে একাধিক প্রার্থী থাকলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এবার সেই প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছে।

 

বাংলাদেশের অবস্থান
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা, জলবায়ু কূটনীতি, রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিকীকরণ এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে অন্যতম বড় অবদানকারী দেশ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে শক্তিশালী কণ্ঠ। এছাড়া উন্নয়নশীল বিশ্বের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার পাশাপাশি মুসলিম বিশ্ব, গ্লোবাল সাউথ ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আফ্রিকা, ওআইসি সদস্য রাষ্ট্র এবং এলডিসি গ্রুপের একটি বড় অংশ বাংলাদেশের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব রাখতে পারে। এছাড়া বাংলাদেশের প্রার্থিতা ‘উন্নয়ন, অন্তর্ভুক্তি ও বহুপাক্ষিকতা’র বার্তার ওপর দাঁড়ানো, যা বর্তমান বৈশ্বিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে অনেক দেশের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

সাইপ্রাসের শক্তি কোথায়
বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হওয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের কূটনৈতিক সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। সূত্র জানায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমন্বিত লবিং, পশ্চিমা দাতা রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন, ছোট কিন্তু সক্রিয় কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক, ইউরোপ-ভিত্তিক বহুপাক্ষিক কৌশল সাইপ্রাসকে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্ত অবস্থানে রেখেছে।

তবে একটি বড় বাস্তবতা হচ্ছে, ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদটি যেহেতু এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের আওতায়, তাই ইউরোপীয় রাষ্ট্র হওয়ায় সাইপ্রাসের প্রার্থিতা নিয়ে কিছু দেশের মধ্যে নীরব আপত্তিও থাকতে পারে।

বাংলাদেশের প্রার্থী
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে বাংলাদেশের প্রার্থী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি দীর্ঘদিন ধরে জলবায়ু কূটনীতি, রোহিঙ্গা ইস্যু ও বহুপাক্ষিক আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন। এর আগে তিনি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া এই পদে অতীতে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতাও রয়েছে। কেননা, বাংলাদেশ ১৯৮৬-৮৭ সালে একবার জাতিসংঘ অধিবেশনে সভাপতির পদে ছিল। সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রায় ৪০ বছর পর আবার সেই পদ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।

কী বলছেন খলিলুর রহমান
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে প্রার্থিতা নিয়ে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে গত ১৫ মে এক অনানুষ্ঠানিক সংলাপে নিজের লক্ষ্যের কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি তার বক্তব্যে বলেন, নির্বাচিত হলে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বা পক্ষের নয়, বরং ‘সবার জন্য পূর্ণকালীন সভাপতি’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জাতিসংঘের প্রতি বিশ্ববাসীর আস্থা পুনরুদ্ধার করতে তিনি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিকে প্রাধান্য দিয়ে কাজ করার প্রস্তাব দেন। সব সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার পাশাপাশি ছোট ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিনিধি দলগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়ারও আশ্বাস দেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মতভেদ দূর করে ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও জাতিসংঘের সনদ পুরোপুরি সমুন্নত রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন ড. খলিলুর রহমান।

সাইপ্রাসের প্রার্থী
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে সাইপ্রাসের প্রার্থী হয়েছেন আন্দ্রেস এস কাকাউরিস। তিনি সাইপ্রাসের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব ও অভিজ্ঞ ইউরোপীয় কূটনীতিক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ সংস্কার ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ে তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সম্প্রতি জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত অনানুষ্ঠানিক সংলাপে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শাসন ও জাতিসংঘ সংস্কারকে নিজের অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেন।

কে এগিয়ে?
বর্তমান কূটনৈতিক হিসাবে লড়াইটি বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও কয়েকটি কারণে বাংলাদেশকে কিছুটা এগিয়ে রাখছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। আলাপকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাতিসংঘের সভাপতি পদে নির্বাচনে বাংলাদেশের পক্ষে যে বিষয়গুলো কাজ করতে পারে এর মধ্যে রয়েছে– গ্লোবাল সাউথের সমর্থন, মুসলিম ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভোট, শান্তিরক্ষা ও জলবায়ু কূটনীতিতে ইতিবাচক ভাবমূর্তি, বৃহৎ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা।

প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রেক্ষাপট
প্রথমদিকে ফিলিস্তিনও এ পদে প্রার্থী ছিল। তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পর মূল লড়াই দাঁড়ায় বাংলাদেশ ও সাইপ্রাসের মধ্যে। জাতিসংঘের আঞ্চলিক রোটেশন পদ্ধতি অনুযায়ী এবার সভাপতি নির্বাচিত হবেন এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে। যদিও সাইপ্রাস ভৌগোলিকভাবে ইউরোপীয় রাষ্ট্র, তবু তারা জাতিসংঘের কূটনৈতিক গ্রুপিংয়ে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপের সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে।

বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশকে সমর্থন
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতি পদে বাংলাদেশকে বিভিন্ন দেশ সমর্থন দিয়েছে। বিভিন্ন কূটনৈতিক বৈঠক, ওআইসি সভা ও দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় এসব সমর্থনের ঘোষণা এসেছে। এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে– সৌদি আরব, পাকিস্তান, তুরস্ক, ফিলিস্তিন, গাম্বিয়া, আলজেরিয়া, লিবিয়া প্রভৃতি দেশ।

এছাড়া বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, ডেনমার্ক প্রভৃতি দেশের কাছেও সমর্থন চাওয়া হয়েছে। তবে বিশেষভাবে মুসলিম দেশগুলোর জোট ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের প্রার্থিতার পক্ষে শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

শেষ পর্যন্ত কে জিতবে?
জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে নির্বাচন সাধারণত গোপন ব্যালটে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে একাধিক প্রার্থীর মধ্যে যদি সাধারণ সম্মতিতে বা সর্বসম্মতিতে কোনো প্রার্থী চূড়ান্ত করা যায়, তবে গোপন ভোটের প্রয়োজন হয় না।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, এ নির্বাচনে ‘সংগঠিত ভোটব্যাংক’ বড় ভূমিকা রাখবে। সেক্ষেত্রে আফ্রিকা, এশিয়া, ওআইসি ও এলডিসি গ্রুপে বাংলাদেশের সক্রিয় কূটনীতি ফল দিতে পারে। তবে পশ্চিমা ব্লকের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি হলে সাইপ্রাসও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ এগিয়ে রয়েছে, তবে ব্যবধান খুব বেশি নয়।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচনে বাংলাদেশের অবস্থানের বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ওবায়দুল হক বাংলানিউজকে বলেন, বাংলাদেশ এই নির্বাচনে সাইপ্রাসের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। বাংলাদেশের প্রার্থীর পক্ষে খুব ভালো প্রচারণাও চলছে। আমরা অবশ্যই আমাদের বাংলাদেশের প্রার্থীর জয়ের বিষয়ে আশাবাদী।

আগামী ২ জুন জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদে আনুষ্ঠানিক নির্বাচন হবে। আর ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে আগামী ৮ সেপ্টেম্বর।