তিনি ছিলেন মার্কিন বিমান বাহিনীর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স অফিসার। জীবনের দীর্ঘ একটা সময় তিনি ব্যয় করেছিলেন মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করে। অংশ নিয়েছিলেন ইরাক যুদ্ধেও।
কিন্তু শত্রুকে আরও ভালোভাবে বুঝতে গিয়ে যখন তিনি কুরআন শরিফ পড়তে শুরু করেন, তখনই তার জীবন পাল্টে যায়। ইসলাম গ্রহণ করে তিনি পাড়ি জমান ইরানে। বর্তমানে তিনি এফবিআইয়ের অন্যতম ওয়ান্টেড আসামী।
মনিকা উইটের জন্ম ইরানি বিপ্লবের বছর। ১৯৭৯ সালে। জন্মগতভাবে তিনি একজন আমেরিকান খ্রিস্টান। ১৮ বছর বয়সেই তিনি মার্কিন বিমান বাহিনীতে যোগদান করেন। কাজ করতে শুরু করেন বিমান বাহিনীর গোয়েন্দা ইউনিটের অধীনে।
ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন ক্রিপ্টোগ্রাফিক ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যানালিস্ট। কর্মক্ষেত্রে অবদানের জন্য তিনি এয়ার মেডেলসহ বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেন।
ক্যারিয়ারে আরও উন্নতি করার জন্য তিনি ফারসি ভাষা শেখেন। এরপর ইরানের সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্সের উপর নজরদারি করার জন্য ২০০২ সালে তাকে নিয়োগ করা হয় সৌদি আরবে, আর ২০০৫ সালে নিয়োগ করা হয় ইরাকে।
এ সময়ই তিনি প্রথম ইসলামের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে তিনি দাবি করেন, শত্রুর মনস্তত্ত্ব আরও ভালোভাবে বোঝার জন্যই তিনি কুরআন শরিফ পড়তে শুরু করেন।
কিন্তু ইসলামকে বুঝতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন, সারা জীবন তার সামনে ইসলামকে যেরকম বিপজ্জনক এবং সহিংস ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, বাস্তবতা মোটেও সেরকম না। তখন থেকেই তার মধ্যে ইসলামের প্রতি, মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি হতে থাকে।
২০০৮ সালে তিনি বিমান বাহিনী থেকে পদত্যাগ করেন। তবে বিভিন্ন ন্যাশনাল সিকিউরিটি কন্ট্রাক্টরের হয়ে তার কাজ অব্যাহত থাকে। তার সে সময়কার কলিগদের বক্তব্য অনুযায়ী, সে সময় তার ঘুমাতে অসুবিধা হতো। ইরাক যুদ্ধের সময় তার অভিজ্ঞতাগুলো তাকে তাড়া করে বেড়াত।
এ সময় তিনি আমেরিকার ড্রোন প্রোগ্রামেরও সমালোচনা করতেন। বিশেষ করে আনওয়ার আল-আওলাকিকে ড্রোন হামলায় হত্যা করার কাছাকাছি সময়ে তিনি কলিগদের সাথে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন।
২০১২ সালে মনিকা উইট আন্তর্জাতিক একটা কনফারেন্সে যোগ দেওয়ার জন্য ইরান ভ্রমণের আমন্ত্রণ পান। এই ভ্রমণেই তার সাথে আইআরজিসি অফিসারদের যোগাযোগ হয়। সেই যোগাযোগই পরবর্তীতে রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ায় রূপ নেয়।
ইরান থেকে ফিরে আসার পরই মনিকা উইটকে হিজাব পরতে দেখা যায়। এ সময়ই তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং পুনরায় ইরানে যাওয়ার জন্য ট্যুরিস্ট ভিসা জোগাড় করার চেষ্টা করেন। এরপর ২০১৩ সালের জুন মাসে তিনি সত্যি সত্যিই স্থায়ীভাবে আমেরিকা ত্যাগ করে ইরানে পাড়ি জমান।
পরবর্তীতে আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জানতে পারে, প্রথমবার ইরান সফরের পর থেকেই তার সাথে আইআরজিসির একজন রিক্রুটারের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। ইরানের ভিসা জোগাড় করতে না পারলে এডওয়ার্ড স্নোডেনের মতো আমেরিকান বিমান বাহিনীর গোপন তথ্য ফাঁস করে দেওয়ার পরিকল্পনাও মনিকার ছিল।
বিমান বাহিনীতে থাকা অবস্থায় মনিকা উইটের টপ সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স ছিল। ধারণা করা হয়, ইরানে যাওয়ার পর তিনি আইআরজিসির হাতে সেসব তথ্য তুলে দেন। ২০১৬ সালে ইরান যখন মার্কিন নেভির ১০ জন অফিসারকে আটক করে, তখন তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদেও মনিকা অংশ নেন বলে ধারণা করা হয়।
সম্প্রতি ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মনিকা উইট নতুন করে আবার আলোচনায় আসেন। কারণ মার্কিন বিমান বাহিনী সম্পর্কে তার যে গভীর জ্ঞান, যুদ্ধে সেটা ইরানের কাজে লাগতে পারে। এক মার্কিন কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, ১ থেকে ১০-এর রেটিং দিতে হলে মনিকা উইটকে তিনি আমেরিকার জন্য ৭ বা ৮ মাত্রার হুমকি হিসেবে রেটিং দিবেন।
এই যুদ্ধে তাই মনিকা উইটও ছিলেন আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। তার অবস্থান জানার জন্য এফবিআই ২ লাখ ডলার পুরস্কার পর্যন্ত অফার করেছিল। যদিও এখন পর্যন্ত তিনি নিরাপদ আছেন বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
CLASSIFIED"">