পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পরও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পদত্যাগ না করায় এক অভূতপূর্ব সাংবিধানিক সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হতে চলেছে। কেননা, রাজ্যটিতে নতুন বিজেপি সরকার সম্ভবত আগামী ৯ই মে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রকাশ্যে জনতার মাঝে শপথ নেবে।
বুধবারই নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিধানসভা গঠনের জন্য নির্বাচন কমিশন বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। ইতিমধ্যেই সেই বিজ্ঞপ্তি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালের কাছে পাঠানো হয়েছে । ফলে এর মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন সরকার গঠনের পথ তৈরি হয়েছে। এরপর বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীকে বরখাস্ত করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ দলকে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের দায়িত্ব রাজ্যপালের ওপর বর্তায়।
নিয়ম অনুযায়ী ৭ই মে বৃহস্পতিবারই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে, যার মাধ্যমে ২০২১ সালে শুরু হওয়া মমতা ব্যানার্জির পাঁচ বছরের কার্যকালেরও অবসান ঘটছে। এর অর্থ হলো, ৭ই মে’র পর মমতা আর মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন না।
মমতা পদত্যাগ না করলেও ৮ই মে এমনিতেই বিধানসভা ভেঙে যাবে। তিনিও তার সদস্যপদ হারাবেন। বিজেপি অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যয়ের এই কর্মকাণ্ডকে সংবিধানের বিরোধিতা বলে মনে করছেন। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সুনীল ফার্নান্দেজ বলেন, পদত্যাগ না করে মমতা কিছুই অর্জন করতে পারবেন না। পদত্যাগে বাধা দিয়ে তিনি কেবল সাংবিধানিক বিশৃঙ্খলাই সৃষ্টি করলেন।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী রাজ্যপাল মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাইতে পারেন। নিয়ম অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নতুন সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়, যার প্রাথমিক ধাপ হলো বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ। সংবিধান অনুযায়ী, রাজভবন থেকে একটি বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করে রাজ্যপাল সরাসরি সরকারকে বরখাস্ত করতে পারেন। এ ছাড়া রাজ্যপাল রাজ্যে সাংবিধানিক ব্যবস্থার অচলাবস্থার কারণ দেখিয়ে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করতে পারেন। রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হওয়া মানেই রাজ্যের সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রের হাতে চলে যাওয়া এবং মুখ্যমন্ত্রীর পদের বিলুপ্তি ঘটা। রাজভবনের অন্দরে এখন এসব নিয়েই আইনি শলাপরামর্শ চলছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, এরকম পরিস্থিতিতে এক বা দুইদিনের জন্য হলেও রাষ্ট্রপতি শাসনই সবচেয়ে সম্ভাব্য পরিণতি। ফলে বিজেপি সরকারের শপথ গ্রহণের আগে একদিনেরও কম সময়ের জন্য হলেও রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে বলে রাজভবন সূত্রে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সাধারণত, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী শপথ গ্রহণ না করা পর্যন্ত বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মমতার পদত্যাগে অস্বীকৃতিতে এবার এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কলকাতা হাইকোর্টের এক সিনিয়র আইনজীবী বলেন, স্বাধীনতার পর আমরা এমনটা কখনো দেখিনি। অতীতে কোনো মুখ্যমন্ত্রীই পদত্যাগ করতে অস্বীকার করেননি।
উল্লেখ্য, ২০০৫ সালে বিহারে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী রাবড়ি দেবীর মেয়াদের পর কোনো স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না আসায় রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হয়েছিল। সেই বছরের শেষের দিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই শাসন বলবৎ ছিল। পরে সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে নীতিশ কুমার ক্ষমতায় আসেন।
এদিকে, বুধবার বিজেপি’র রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সচিবালয় নবান্নে গিয়ে ব্রিগেডে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সংক্রান্ত বিষয়ে রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিওয়ালার সঙ্গে আলোচনা করেন। তার সঙ্গে ছিলেন বিজেপি’র কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক তথা পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি পর্যবেক্ষক সুনীল বনশাল। ছিলেন রাজ্য বিজেপি’র সাধারণ সম্পাদক জ্যোতির্ময় মাহাতো এবং সৌমিত্র খাঁ। নবান্নে প্রবেশের আগে সাংবাদিকদের শমীক বলেন, আগামী শনিবার পঁচিশে বৈশাখ ব্রিগেডে শপথ নতুন মুখ্যমন্ত্রীর। মুখ্যমন্ত্রীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ উপস্থিত থাকবেন। এ ছাড়াও ২০ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন। তবে মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন, তা নিয়ে জল্পনা তৈরি হলেও সরকারি ভাবে নাম বলতে নারাজ বিজেপি নেতৃত্ব। শুক্রবার বিজেপি’র নবনির্বাচিত বিধায়কদের নিয়ে পরিষদীয় দলের বৈঠক হবে। কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত থাকবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সহ পর্যবেক্ষক হিসেবে থাকবেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি। সেই বৈঠক থেকেই মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করা হবে। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে সরকার গঠনের দাবি জানানো হবে।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বুধবার নবনির্বাচিত বিধায়কদের সঙ্গে এক বৈঠকে দৃঢ় মনোভাব প্রকাশ করেছেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, তিনি পদত্যাগ করবেন না এবং বিধানসভার ভেতরে প্রতিবাদ প্রদর্শনের ডাক দিয়েছেন। তিনি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন, আমি পদত্যাগ করবো না। ওরা আমাকে বরখাস্ত করুক। আমি চাই- এই দিনটি একটি কালো দিন হোক। আমাদের শক্তিশালী হতে হবে। বিধানসভার প্রথম দিনে কালো পোশাক পরুন। যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাদের দল থেকে বের করে দেয়া হবে। আমি হাসছি। আমি তাদের নৈতিকভাবে পরাজিত করেছি। আমি মুক্ত পাখি। আমি সবার জন্য কাজ করেছি। আমরা হয়তো হেরে গেছি কিন্তু আমরা লড়াই করবো।