যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টায় অবস্থিত এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপক গাজায় ইসরায়েলের হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার দায়ের করা এই মামলায় অধ্যাপকরা অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালে ক্যাম্পাস থেকে বিক্ষোভকারীদের সরাতে পুলিশ ও স্টেট ট্রুপারদের ডেকে এনে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের নীতি ভঙ্গ করেছে। সেদিন পুলিশ অত্যন্ত আগ্রাসীভাবে বিক্ষোভ ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং মোট ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করে।
মামলার অন্যতম বাদী দর্শনের অধ্যাপক নোয়েল ম্যাকাফি বলেন, ‘বিচার বিভাগ নিশ্চিতভাবেই দেখতে পাবে এমরি তার শিক্ষার্থী ও কর্মীদের রক্ষা করতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগত লক্ষ্য বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এটি কেবল কয়েকজন ব্যক্তির অধিকারের বিষয় নয়। আমাদের শিক্ষাগত লক্ষ্যই হলো মানুষকে মুক্ত ও গঠনমূলক চিন্তায় অভ্যস্ত করা এবং অন্যদের সাথে নির্ভয়ে যুক্ত হতে শেখানো।’
মামলার বিষয়ে এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র লরা ডায়মন্ড এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মনে করে এই মামলাটি ভিত্তিহীন। ক্যাম্পাস সম্প্রদায়কে যেকোনো হুমকি বা ক্ষতি থেকে নিরাপদ রাখতে এমরি যথাযথ ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিয়েছে। বিষয়টি আদালতে গড়ানোয় আমরা দুঃখিত, তবে আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আমাদের আস্থা আছে।’
২০২৩ ও ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভের যে ঢেউ উঠেছিল, তার রেশ এখনো কাটেনি—এই মামলাটি তারই এক উদাহরণ। এর আগে অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগে মামলা করলেও এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মামলাটি কিছুটা ব্যতিক্রম। কারণ মামলার তিন বাদী, দর্শনের অধ্যাপক নোয়েল ম্যাকাফি, ইংরেজি ও আদিবাসী শিক্ষা বিভাগের অধ্যাপক এমিলিও দেল ভালে-এসকালান্তে এবং অর্থনীতির অধ্যাপক ক্যারোলিন ফোহলিন—সবাই এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী (টেনিউরড) শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে আনা কোনো অভিযোগই আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
ডেকাল্ব কাউন্টি স্টেট কোর্টে দায়ের করা এই দেওয়ানি মামলায় অধ্যাপকরা তাদের বিরুদ্ধে আনা ফৌজদারি অভিযোগগুলো মোকাবিলা করতে যে অর্থ ব্যয় হয়েছে, তা ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন।
অধ্যাপক ম্যাকাফি বলেন, তিনি তার নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন মূলত তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে এবং নীতি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করতে। তিনজন অধ্যাপকই জানান, ২০২৪ সালের ২৫ এপ্রিল যখন কিছু শিক্ষার্থী গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চত্বরে তাঁবু গেড়ে বিক্ষোভ শুরু করেন, তখন তারা সেখানে কেবল পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। তাদের অভিযোগ, কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না খুঁজে সরাসরি পুলিশ ডেকে এমরি কর্তৃপক্ষ নীতি লঙ্ঘন করেছে।
গ্রেপ্তারের সময়কার বর্ণনা দিয়ে ম্যাকাফি জানান, একজন বিক্ষোভকারীকে পুলিশ নিষ্ঠুরভাবে গ্রেপ্তার করার সময় তিনি শুধু ‘থামুন!’ বলে চিৎকার করেছিলেন, যার জন্য তাকে ‘অশোভন আচরণের’ অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। অধ্যাপক এমিলিও জানান, তিনি একজন বয়স্ক নারীকে সাহায্য করতে গিয়েছিলেন এবং তাকেও একই অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।
অন্যদিকে অধ্যাপক ফোহলিন জানান, পুলিশ যখন একজন বিক্ষোভকারীকে মাটিতে চেপে ধরছিল তখন তিনি এর প্রতিবাদ করেন। ফলে তাকেও মুখ থুবড়ে মাটিতে আছাড় দিয়ে গ্রেপ্তার করা হয়, যার ফলে তিনি মাথায় আঘাত ও মেরুদণ্ডে চোট পান। তার বিরুদ্ধে পুলিশকে আঘাত করার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
ঘটনার সময় এমরি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল যে গ্রেপ্তারকৃতরা বহিরাগত এবং তারা অনধিকার প্রবেশ করেছেন। তবে দেখা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া ২৮ জনের মধ্যে ২০ জনই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে যুক্ত। অধ্যাপকরা আরও অভিযোগ করেছেন যে, গ্রেপ্তারের পর তারা রক্ষণশীলদের দিক থেকে বিভিন্ন হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। সমর্থকদের দাবি, পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘ফিলিস্তিন ব্যতিক্রম’ (Palestine exception) বলে একটি অলিখিত নীতি কাজ করছে, যার আওতায় ফিলিস্তিনপন্থি মতপ্রকাশ ও বিক্ষোভকে দমন করার চেষ্টা করা হয়। আইনি সহায়তা সংস্থা ‘প্যালেস্টাইন লিগাল’ জানিয়েছে, ২০২৫ সালে তারা ২০২৩ সালের তুলনায় ৩০০ শতাংশ বেশি আইনি সহায়তার আবেদন পেয়েছে, যার অধিকাংশই কলেজ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছ থেকে আসা।
গ্রেপ্তারের পর অধ্যাপক ম্যাকাফি এমরি ইউনিভার্সিটি সেনেটের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মতপ্রকাশের নীতিমালা তৈরিতে সহায়তা করেছেন। তিনি জানান, ২০২৪ সালের শেষের দিকে তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রেগরি ফেনভেসকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কেন পুলিশ তাদের ওপর থেকে অভিযোগ তুলে নিচ্ছে না।
ম্যাকাফির দাবি, প্রেসিডেন্ট তখন উত্তর দিয়েছিলেন যে তিনি ‘বিচার দেখতে চান’। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালা সংশোধন করে তাঁবু খাটানো, ক্যাম্প করা, ভবন দখল এবং রাত ১২টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে অধ্যাপক ম্যাকাফি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতির কারণে শিক্ষার্থীরা এখন বিক্ষোভে অংশ নিতে ভয় পাচ্ছেন। তার মতে, আটলান্টার নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা জন লুইস যেটিকে ‘ভালো ঝামেলা’ (good trouble) বলতেন, বিশ্ববিদ্যালয় সেই পথ থেকে সরে এসেছে। শিক্ষার্থীরা এখন জানেন এমরি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ঝামেলাই ‘ভালো’ হিসেবে গণ্য হবে না এবং তারা যে কোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা