উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে নিয়ে চলমান সংঘাত ক্রমেই রূপ নিচ্ছে জটিল আকারে। সামরিক উত্তেজনা, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং অর্থনৈতিক চাপ সবকিছুর মধ্যেই এই যুদ্ধ এখন পেয়েছে এক ভিন্ন মাত্রা।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধকে শুধু সামরিক শক্তি বা কৌশলগত অবস্থানের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। এর ভেতরে কাজ করছে আরেকটি নীরব কিন্তু নির্ধারক শক্তি ‘সময়’।
এই সংঘাতে তিনটি দেশ তিনটি ভিন্ন রাজনৈতিক ঘড়ির ভেতরে অবস্থান করছে। সেই ঘড়ির গতি, চাপ এবং সীমাবদ্ধতাই নির্ধারণ করছে তাদের কৌশল, সিদ্ধান্ত এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের গতিপথ।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সমাধান খুঁজছে, অন্যদিকে ইরান সময় টেনে নেওয়ার কৌশলে আর ইসরায়েল চাইছে সংঘাত দীর্ঘায়িত হোক। এই তিন ভিন্ন ‘ঘড়ি’ই যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণে রাখছে বড় ভূমিকা ।
রাজনৈতিক সময়সীমার চাপে ওয়াশিংটন
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফিরে এসে ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজতে শুরু করেন। তার কৌশল ছিল স্পষ্ট—দ্রুত চাপ, দ্রুত ফল। ওমানে দূত পাঠানো এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সেই কৌশল বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু এই দ্রুত ফলের হিসাব মেলেনি। ইরানের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি, বরং সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক ক্ষয়যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে সময় তার বিরুদ্ধে কাজ করতে শুরু করেছে।
শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন মেয়ারশেইমার মনে করেন, ইরানের ভৌগোলিক বিস্তৃতি ও সামরিক কাঠামো এমন যে, দ্রুত আঘাতে সেটিকে অকার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। অর্থাৎ, যুক্তরাষ্ট্র যে দ্রুত ফলের কৌশল নিয়েছিল, তা বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক চাপ। তেলের দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব সরাসরি পড়ছে মার্কিন ভোটারদের ওপর। সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা।
অর্থাৎ, ওয়াশিংটনের ঘড়ি দ্রুত চলছে। সময় এখানে শুধু কৌশলগত নয়, রাজনৈতিক দায়ও তৈরি করছে।
টিকে থাকার কৌশলে ইরান
ইরানের অবস্থান এই চিত্রের বিপরীত। তারা দ্রুত ফল চায় না, বরং দীর্ঘ সময় টিকে থাকার কৌশল নিয়েছে।
২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ইরান বড় আঘাত পেয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হয়েছেন। সামরিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবুও রাষ্ট্র ভেঙে পড়েনি।
এখানেই ইরানের কৌশলগত শক্তি। তারা জানে, সরাসরি সামরিক জয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সময় ধরে রাখা।
অর্থনীতিবিদ জেফ্রি স্যাক্স মনে করেন, এই সংঘাতের মূল সমস্যা কূটনৈতিক ব্যর্থতা। তার মতে, পূর্ববর্তী পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করেই যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সংঘাতের পথ তৈরি করেছে, যার শেষ সহজ নয়।
ইরান এখন সহনশীলতার কৌশল অনুসরণ করছে। তারা আঘাত সহ্য করছে, কিন্তু ভেঙে পড়ছে না। এর পেছনে রয়েছে তাদের ভৌগোলিক বিস্তৃতি, বিকেন্দ্রীকৃত সামরিক কাঠামো এবং আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক।
সবচেয়ে বড় বিষয়, হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের প্রভাব। বৈশ্বিক তেলের বড় একটি অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই সরবরাহে বিঘ্ন ঘটাতে পারলে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধাক্কা লাগবে। যার প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে।
অর্থাৎ, তেহরানের ঘড়ি ধীরে চলছে। কিন্তু সেই ধীর গতি আসলে কৌশলগত, প্রতিপক্ষকে ক্লান্ত করার জন্য।
দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কৌশল ইসরায়েলের
ইসরায়েলের ক্ষেত্রে সময়ের হিসাব আবার ভিন্ন। বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই যুদ্ধ শুধু নিরাপত্তা ইস্যু নয়, বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। সামনে নির্বাচন, পাশাপাশি আইনি চাপ এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধ একটি রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে কাজ করছে।
যুদ্ধ জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়, বিরোধীদের দুর্বল করে এবং জনসমর্থনকে এক জায়গায় নিয়ে আসে। এই কারণে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়া ইসরায়েলের জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক হতে পারে।
সাংবাদিক গিডিয়ন লেভি দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, ইসরায়েলের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সামরিক সমাধান প্রায়শই প্রথম পছন্দ হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে সাবেক আলোচক ড্যানিয়েল লেভি মনে করেন, ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার।
এই প্রেক্ষাপটে, যুদ্ধ শুধু বর্তমান সংকট নয় বরং ভবিষ্যৎ ভূরাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের একটি উপায়।
অর্থাৎ, তেল আবিবের ঘড়ি থামতে চায় না। বরং যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, তাদের কৌশলগত সুযোগ তত বাড়বে।
তিন ঘড়ি, এক সংঘাত
এই যুদ্ধের আসল সংঘর্ষটা শুধু সীমান্তে নয়, সময়েও। তিন পক্ষ তিনটি ভিন্ন ঘড়ি নিয়ে খেলছে, আর সেই অমিলই সংঘাতকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
ওয়াশিংটনের জন্য সময় কমে আসছে। নির্বাচন যত কাছে আসছে, যুদ্ধ ততই রাজনৈতিক বোঝা হয়ে উঠছে। দ্রুত কোনো ফল না এলে এই সংঘাত ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।
তেহরানের হিসাব ঠিক উল্টো। তাদের লক্ষ্য জেতা নয়, টিকে থাকা। তারা জানে, সময় যত বাড়বে, প্রতিপক্ষের ভেতরের চাপ তত বাড়বে। এটাই তাদের কৌশল।
আর তেল আবিবের জন্য সময় এক ধরনের সুযোগ। যুদ্ধ চলমান থাকলে অভ্যন্তরীণ চাপ কমে, কৌশলগত লক্ষ্য এগোনোর সুযোগ তৈরি হয়। ফলে সংঘাত থেমে যাওয়া তাদের জন্য সবসময় অগ্রাধিকার নয়।
এই যুদ্ধে কার সময় আগে ফুরাবে?
এই তিন ভিন্ন সময়বোধই যুদ্ধকে একটি জটিল সমীকরণে পরিণত করেছে। এখানে প্রশ্নটা কে শক্তিশালী, তা নয়। প্রশ্নটা হলো, কে কতদিন টিকে থাকতে পারবে।
এই যুদ্ধ দেখাচ্ছে, সময় শুধু একটি প্রেক্ষাপট নয়, এটি নিজেই একটি কৌশল। যে পক্ষ সময়কে নিজের পক্ষে কাজে লাগাতে পারবে, শেষ পর্যন্ত সুবিধা তার দিকেই যাবে। সামরিক শক্তি, কূটনীতি কিংবা অর্থনীতি সবকিছুর ওপরে এখন প্রভাব ফেলছে এই অদৃশ্য উপাদানটি।
বর্তমান বাস্তবতায় মনে হচ্ছে, সবচেয়ে দ্রুত চাপের মধ্যে পড়ছে ওয়াশিংটন। কারণ তাদের সময় সীমিত, আর সেই সময়ই এখন তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
এই কারণেই প্রশ্নটা এখন নতুনভাবে দাঁড়ায়—এই যুদ্ধে কে জিতবে, তা নয়; বরং কার সময় আগে ফুরিয়ে যাবে, সেটাই দেখার বিষয়।
অধ্যাপক মেয়ারশেইমারের মতে, ইরান ইতোমধ্যে নৈতিকভাবে জিতে গেছে। কারণ তারা প্রাথমিক প্রচণ্ড আঘাত সহ্য করে টিকে গেছে এবং ওয়াশিংটনকে পিছু হটার রাস্তা খুঁজতে বাধ্য করেছে।