Image description

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরেকটি সমান্তরাল অগ্রগতি নতুন করে দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে একটি নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি এমন জল্পনা তৈরি করেছে যে, ওয়াশিংটনের দৃষ্টি এখন মালাক্কা প্রণালির দিকেও বিস্তৃত হতে পারে। মালাক্কা হলো বৈশ্বিক বাণিজ্যের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। এ সপ্তাহের শুরুতে চূড়ান্ত হওয়া চুক্তিটি মার্কিন সামরিক বিমানকে ইন্দোনেশিয়ার আকাশসীমায় বাড়তি কার্যক্রমের সুযোগ দেবে। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরা হলেও, এর মাধ্যমে মালাক্কা প্রণালির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি ও সামরিক কার্যক্ষমতা বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রণালিটি ভারত মহাসাগরকে পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি।

 

ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর যৌথভাবে এই পথটি পরিচালনা করে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ চলাচল করে। তবে চুক্তিটির সময়কাল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে- যুক্তরাষ্ট্র কি মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক ‘চোকপয়েন্ট’গুলো সুরক্ষায় তার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল পুনর্গঠন করছে?

বৈশ্বিক বাণিজ্যে মালাক্কার কৌশলগত গুরুত্ব
হরমুজ প্রণালি যেখানে মূলত বৈশ্বিক তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে মালাক্কা প্রণালি আরও বিস্তৃত বাণিজ্যিক জীবনরেখা হিসেবে কাজ করে। এটি জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি তৈরি পোশাক, ইলেকট্রনিক্স ও শিল্প উপাদান পরিবহনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য চলাচলের কারণে এর গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এই পথটি বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিগুলোর জন্য অপরিহার্য। চীন এই রুটের ওপর জ্বালানি আমদানির জন্য ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা বেইজিংয়ের কাছে দীর্ঘদিন ধরে একটি কৌশলগত দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত, যা ‘মালাক্কা দ্বিধা’ নামে পরিচিত। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি অর্থনৈতিক নির্ভরতা তুলনামূলক কম, তবুও তারা এই প্রণালিকে কৌশলগত ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে। এর কিছু অংশ খুবই সরু হওয়ায়, ভবিষ্যৎ কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে এটি একটি সম্ভাব্য ‘বটলনেক’ বা চাপ প্রয়োগের স্থান হয়ে উঠতে পারে।

ভারতের ভৌগোলিক সুবিধা ও বাড়তে থাকা ভূমিকা
মালাক্কা প্রণালি ঘিরে পরিবর্তিত পরিস্থিতি ভারতকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নিয়ে এসেছে। প্রণালিটির পশ্চিম প্রান্তের কাছে অবস্থিত আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ভারতকে সামুদ্রিক চলাচল পর্যবেক্ষণের একটি স্বাভাবিক সুবিধা দেয়। এই অঞ্চলে ভারতের সামরিক অবকাঠামো বিশেষ করে ক্যাম্পবেল বে’তে অবস্থিত দক্ষিণতম বিমানঘাঁটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ পর্যবেক্ষণে সহায়তা করে। পাশাপাশি চলমান অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ভারতের সামুদ্রিক সক্ষমতা আরও বাড়াবে, যা বিশ্বের ব্যস্ততম শিপিং করিডোরগুলোর একটির কাছে তাদের উপস্থিতি শক্তিশালী করবে। এই ভৌগোলিক অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে, বিশেষ করে অঞ্চলে চীনের প্রভাব মোকাবিলার প্রেক্ষাপটে।

জটিল আঞ্চলিক বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় চ্যালেঞ্জ হতে পারে
তবে মালাক্কা প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি ভূমিকা বাস্তবায়নে আঞ্চলিক জটিলতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ভাগাভাগি করে, যেখানে সার্বভৌমত্ব ও সামুদ্রিক সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিনের সংবেদনশীলতা রয়েছে। অন্যদিকে, প্রণালির একটি ছোট অংশ নিয়ন্ত্রণ করলেও সিঙ্গাপুর তার উন্নত বন্দর অবকাঠামো এবং বৈশ্বিক শিপিং সেবায় আধিপত্যের কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘বাংকারিং’ কার্যক্রমসহ সামুদ্রিক খাতটি তাদের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। ফলে আঞ্চলিক শিপিং রুটের স্থিতিশীলতা তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বৈশ্বিক পর্যায়ে সামুদ্রিক টোল ও বিধিনিষেধ নিয়ে বিতর্কও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, ওয়াশিংটনের পরিবর্তিত অবস্থান ইঙ্গিত দেয় যে, তারা একই সঙ্গে একাধিক কৌশলগত সামুদ্রিক পথ সুরক্ষায় মনোযোগ দিচ্ছে।