Image description

পাকিস্তান সৌদি আরব এবং কাতারের কাছ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহায়তা পেতে যাচ্ছে। এই সহায়তা দেশটির ভঙ্গুর অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক অবস্থানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে। এমন সময়ে এই খবর এল যখন দেশটির অর্থমন্ত্রী মুহাম্মদ আওরঙ্গজেব আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের সভায় যোগ দিতে এবং দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিকে এগিয়ে নিতে গতকাল শনিবার ওয়াশিংটনের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছেন।

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ডনের খবরে বলা হয়েছে, এই প্রত্যাশিত অর্থ প্রবাহ এমন এক সন্ধিক্ষণে আসছে যখন ইসলামাবাদ এই মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে পাকিস্তান বিশ্বব্যাপী ঋণদাতাদের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংলাপে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে।

ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা বলছেন, এই সফরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কারণ, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রচেষ্টাকে এশীয় এবং বিশ্ববাজারের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। আওরঙ্গজেব ২০২৬ সালের ১৩ থেকে ১৮ এপ্রিল ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আইএমএফের বসন্তকালীন সভায় অংশগ্রহণ করবেন।

নীতিনির্ধারকরা আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে আওরঙ্গজেবের এই সংশ্লিষ্টতাকে একটি বিস্তৃত কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন। তারা ইঙ্গিত দিচ্ছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর্মসূচির শর্তাবলির কঠোর পরিপালন বা সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ তৃতীয় পক্ষের গ্যারান্টারদের ওপর নির্ভর করার মতো প্রথাগত বিষয়গুলো কম গুরুত্ব পেতে পারে।

দেশ ত্যাগের আগে আওরঙ্গজেব ইসলামাবাদে সৌদি অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-জাদানের সঙ্গে বৈঠক করেন। আল-জাদান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সাথেও সাক্ষাৎ করেছেন। এটি এমন এক সময়ে সৌদি আরবের অব্যাহত সমর্থনের প্রতিফলন যখন পাকিস্তান সংযুক্ত আরব আমিরাতের বকেয়া ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

সরকার সম্প্রতি বর্তমান মাসের শেষ নাগাদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে, যা ২০১৮ সাল থেকে বারবার সময় বৃদ্ধি (রোল ওভার) করা হচ্ছিল।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, দেশের দুর্বল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এড়াতে সৌদি আরব এবং কাতার পাকিস্তানকে ৫ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। তুরস্কের রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদ সংস্থা আনাদোলু নিউজ এজেন্সি পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এই খবর জানিয়ে বলেছে যে, ইসলামাবাদ নগদ আমানতের সীমা বৃদ্ধি এবং তেল আমদানির অর্থায়ন সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোসহ অতিরিক্ত সহায়তা চেয়েছে, যার মেয়াদ এই মাসের শেষে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈঠকে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ঘোষণা করা না হলেও দুই দেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বর্ধিত আর্থিক সহায়তার বিষয়ে আলোচনা ইতিপূর্বেই শুরু হয়েছে। সৌদি আরব এবং কাতারের এই অতিরিক্ত সহায়তা পাকিস্তানকে বর্তমান অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই সমস্ত পাওনা পরিশোধে সাহায্য করবে।

সৌদি অর্থমন্ত্রীর এই সফর এমন এক সময়ে হচ্ছে যখন দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ছে। সৌদি আরব শনিবার নিশ্চিত করেছে, যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় পাকিস্তান বিমান বাহিনীর প্রথম দল, যুদ্ধবিমান এবং সহায়ক বিমানসহ কিং আব্দুল আজিজ বিমান ঘাঁটিতে পৌঁছেছে।

পাকিস্তানকে সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সৌদি আরব একটি বড় উৎস। এ পর্যন্ত তারা ৫ বিলিয়ন ডলারের আমানত বারবার সময় বৃদ্ধি করে পাকিস্তানের কাছে রেখেছে। আইএমএফ শর্ত দিয়েছে, পাকিস্তানের চলমান তিন বছর মেয়াদী কর্মসূচি শেষ না হওয়া পর্যন্ত সৌদি আরব, চীন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতকে তাদের নগদ আমানত বহাল রাখতে হবে। তবে মনে হচ্ছে, এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের জায়গা নেবে কাতার।

ইসলামাবাদে সংক্ষিপ্ত সফরের পর, অর্থমন্ত্রী আওরঙ্গজেব গত রাতে ইসলামাবাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার সৌদি সমকক্ষকে বিদায় জানান। কর্মকর্তারা এই সফরকে একটি ফলপ্রসূ আলোচনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

বিদায় বেলায় দুই নেতা সৌজন্য বিনিময় করেন এবং পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও চলমান অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেন। আওরঙ্গজেব ওয়াশিংটনে পুনরায় মোহাম্মদ আল-জাদানের সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন, যা দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও দীর্ঘস্থায়ী অংশীদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আন্তর্জাতিক ঋণদাতারা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকট এড়াতে পাকিস্তানের ভূমিকার কথা ক্রমবর্ধমানভাবে বিবেচনা করছে। তিনি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরবচ্ছিন্ন তেল সরবরাহ নিশ্চিত করা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য, কারণ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথেই হয়ে থাকে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, “আমরা আশা করি এই প্রচেষ্টাগুলো স্বীকৃত হবে,” ওই কর্মকর্তা বলেন। তিনি আরও যোগ করেন যে, বৈশ্বিক ঋণদাতাদের সাথে আলোচনায় ইসলামাবাদ এখন শান্তির লভ্যাংশ (peace dividends) খুঁজছে।’

কর্মকর্তারা বলছেন, আলোচনা সহজতর করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকা দেশটির নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে, যা আন্তর্জাতিক ঋণদাতাদের সাথে চলমান সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলবে বলে তারা বিশ্বাস করেন। তাদের মতে, ইসলামাবাদ যেভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে তার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। একইভাবে এটি অর্থনীতিকে স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে এবং কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সক্ষম।

তারা আরও যোগ করেছেন, এই বর্ধিত গ্রহণযোগ্যতা বৈশ্বিক ঋণদাতাদের আরও নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সাহায্য করতে পারে। ফলে রাজস্ব ঘাটতি বা নির্দিষ্ট সংস্কার ব্যবস্থার বিলম্বের মতো বিচ্ছিন্ন বিষয়গুলোর চেয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক পারফরম্যান্সের ওপর বেশি জোর দেওয়া হতে পারে।