Image description

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী নাটক ‘রক্তকরবী’র যক্ষপুরীর কথা চলে এলো সামনে। যেখানে কেবলই সোনা আর সম্পদ তোলার উন্মত্ততা, আর সেই অসীম লোভের যাঁতাকলে প্রতিনিয়ত পিষ্ট হয় সাধারণ মানুষের প্রাণ। পরাশক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই আর অস্ত্রের ঝনঝনানিতে ৪০ দিন ধরে গোটা মধ্যপ্রাচ্য যেন আক্ষরিক অর্থেই এক আধুনিক যক্ষপুরীতে পরিণত হয়েছিল। আকাশ থেকে পড়া হাজারো বোমায় হাজারো নিরীহ মানুষের রক্তে ভারী হয়ে উঠেছিল এই অঞ্চলের বাতাস। ঠিক যখন মনে হচ্ছিল, আইরিশ নাট্যকার স্যামুয়েল বেকেটের বিখ্যাত নাটক ‘ওয়েটিং ফর গডো’র মতো শান্তির প্রতীক্ষা কেবলই এক অন্তহীন প্রহসন, ‘গডো’ আর কখনই আসবে নাÑ ঠিক তখনই ঘোর অন্ধকারের মাঝে এক চিলতে আশার আলো দেখা দিল। আর সেই আলোর রেখার উৎসস্থল হিসেবে এবার বিশ্বমঞ্চে আবির্ভূত হলো মারগাল্লা পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা শহরÑ ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের রাজধানীতে কাল ইরান-মার্কিন শান্তি বৈঠক বসছে। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে এই বৈঠকের দিকেই দৃষ্টি সারা বিশ্বের। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এবং চীনের সহযোগিতায় বুধবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

ইসলামাবাদের আগামীকালের এ বৈঠক এক ঐতিহাসিক আয়োজন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার অন্যতম উদাহরণ হতে যাচ্ছে এই সংলাপ।

যারা অংশ নিচ্ছেন শান্তি সংলাপে : পাকিস্তানের প্রভাবশালী গণমাধ্যম ডন গতকাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সাময়িক যুদ্ধবিরতির এই নাজুক সুতোটি ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। একসময়কার কট্টর ট্রাম্প-সমালোচক ও ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাবেক এই মেরিন সেনা এখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র। তার সঙ্গে থাকছেন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। যদিও এই দুজন মার্কিন দূতকে নিয়ে তেহরানের চরম আপত্তি রয়েছে, ইরান মনে করে, এই দুই ব্যক্তি ‘পিছন থেকে ছুরি মারতে’ ওস্তাদ। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ও পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। আরাগচি কিশোর বয়সেই ১৯৭৯ সালের বিপ্লবে যোগ দিয়েছিলেন, লড়েছেন ইরান-ইরাক যুদ্ধে। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির সময় তার কঠোর দর-কষাকষির সুনাম রয়েছে। অন্যদিকে, গালিবাফ ইরানের বিপ্লবী বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক এরোস্পেস কমান্ডার ও নিহত জেনারেল কাশিম সোলাইমানির ঘনিষ্ঠ সহযোগী। তিনি রাজনৈতিক ও সামরিকÑ উভয় ক্ষেত্রেই ইরানের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী মুখ। ফলে দুই পক্ষের এই হেভিওয়েট লাইনআপই বলে দিচ্ছে, এই আলোচনা কতটা স্নায়ুক্ষয়ী হতে যাচ্ছে।

নিñিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিতে সবরকম উদ্যোগ : দুই চিরশত্রু দেশের প্রতিনিধিদের আতিথ্য দিতে গিয়ে পাকিস্তান কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাইছে না। ‘রেড জোন’ খ্যাত ইসলামাবাদের কূটনৈতিক এলাকাকে এরই মধ্যে নিñিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে ৩০ সদস্যের একটি মার্কিন অগ্রগামী দল আগেভাগেই ইসলামাবাদে পৌঁছেছে।

পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি মার্কিন রাষ্ট্রদূত নাটালি বেকারকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, ভ্যান্সসহ আগত অতিথিদের জন্য নিñিদ্র নিরাপত্তার সবরকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভিভিআইপি প্রোটোকল অনুযায়ী সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার রাজধানী ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিন্ডিতে স্থানীয় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। রেড জোনের একটি বিলাসবহুল হোটেল পুরোপুরি খালি করে ফেলা হয়েছে অতিথিদের জন্য। এক্সপ্রেস হাইওয়েসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ট্রাফিক চলাচলে আনা হয়েছে কড়াকড়ি। যে কোনো জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে সব সরকারি হাসপাতাল ও উদ্ধারকারী দলগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে।

দুই পক্ষের দাবি-দাওয়া পুরোপুরি বিপরীত : সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলোচনার টেবিল প্রস্তুত হলেও, সমাধানের পথ কতটা সুগম হবে, তা নিয়ে সংশয় বিস্তর। কারণ, দুই পক্ষের দাবিদাওয়া একেবারে বিপরীত মেরুর। যে কোনো এক পক্ষকে বিশাল ছাড় দিতেই হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের হাতে রয়েছে ১৫ দফার একটি প্রস্তাব, আর ইরানের হাতে রয়েছে ১০ দফার নিজস্ব শর্ত। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি বিনাশর্তে ও সব ধরনের টোল বা ফি ছাড়া সবার জন্য উন্মুক্ত করা। ট্রাম্প চাইছেন, ইরান যেন তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেয়। ট্রাম্প তো ‘পুরো সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার’ হুমকি দিয়ে ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু সামরিকভাবে প্রবল চাপে থাকলেও ইরান মাথানত করেনি। তাদের দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে চায়। তাদের অন্যতম শর্ত হলো, সব ধরনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার, যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং ওই অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে লেবানন ইস্যু। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধবিরতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো লেবানন। কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দম্ভভরে বলছেন, লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা অব্যাহত থাকবে। ইরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ইসরায়েলের এই আগ্রাসন না থামলে যুদ্ধবিরতির কোনো অর্থ নেই। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন বলছে, লেবানন এই চুক্তির অংশ নয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় মিত্ররা এবং জাতিসংঘও লেবাননকে যুদ্ধবিরতির চুক্তির আওতার মধ্যে রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

শান্তির দূত হতে চাইছে পাকিস্তান : টাইম ম্যাগাজিনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক কূটনীতির এই জটিল দাবা খেলায় শান্তির দূত হিসেবে আবির্ভূত হতে চাইছে পাকিস্তান। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তারা কি সফল হতে পারবে? পাকিস্তানের এই মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে আসা মোটেও আকস্মিক নয়। তারা এমন এক ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে, যা তাদের এই ভূমিকার জন্য আদর্শ করে তুলেছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্রতা, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সরাসরি হস্তক্ষেপে এই যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে। আসিম মুনিরের সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সখ্য ও ভ্যান্সের সঙ্গে সুসম্পর্ক এখানে জাদুর মতো কাজ করেছে। ট্রাম্প তো মুনিরকে তার ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ তকমা দিয়েছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বেইজিং থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ চষে বেড়িয়েছেন এই শান্তির রূপরেখা তৈরিতে।

আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের নিজস্ব স্বার্থও এখানে প্রবল। উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে পাকিস্তানের নাজুক অর্থনীতি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে ও সেখানে কর্মরত ৫০ লাখ প্রবাসীর পাঠানো তিন হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলারের রেমিট্যান্স আসা বন্ধ হলে চরম সংকটে পড়বে ইসলামাবাদ। তাই নিজেদের পিঠ বাঁচাতেও তাদের এই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। কিন্তু ইসরায়েলের ওপর যেহেতু পাকিস্তানের কোনো প্রভাব নেই, তাই লেবানন ইস্যু সমাধানে তাদের হাত-পা প্রায় বাঁধা। চুক্তি ভেস্তে গেলে এর কূটনৈতিক দায়ভারও পাকিস্তানের ঘাড়েই পড়তে পারে।

স্থায়ী ক্ষত বয়ে বেড়াবে বিশ্ব অর্থনীতি : যুদ্ধ যদি আজই থেমে যায়, তবু কি বিশ্ব অর্থনীতি আগের অবস্থায় ফিরতে পারবে? আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা এই প্রশ্নের একটি নির্মম উত্তর দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছেন, শান্তি ফিরলেও ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে, তা চিরস্থায়ী রূপ নেবে।

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জর্জিয়েভার মনে করেন, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির হার আগের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেকটাই কমে যাবে। আইএমএফ ২০২৬ সালের জন্য ৩ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে পূর্বাভাস দিয়েছিল, তা এখন আর কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে আশাবাদী দৃশ্যপট বিবেচনা করলেও প্রবৃদ্ধির হার কমাতেই হবে। অর্থনীতি সুন্দরভাবে পুরনো রূপে ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই।’

যুদ্ধবিধ্বস্ত অবকাঠামো, বিশেষ করে তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলো ঠিক করতে দীর্ঘ সময় লাগবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় তেলের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। জর্জিয়েভা সতর্ক করে বলেছেন, জ্বালানি তেল আমদানিকারক দেশ ও গরিব রাষ্ট্রগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর অ্যান্ড্রুু বেইলিও এই শঙ্কার কথা স্বীকার করে বলেছেন, পরিস্থিতি এতটাই অস্থিতিশীল যে, সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবতে হয় বিশ্বটা এখনও টিকে আছে তো!

ইসলামাবাদের সবুজ ছায়ায় ঘেরা পরিবেশে আজ যখন দুই পরাশক্তির প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বসবেন, তখন তাদের সামনে শুধু একটি অঞ্চলের শান্তি নয়, বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতির চাকা সচল রাখার এক বিশাল দায়ভার থাকবে। যক্ষপুরীর রাজা কি জালের আড়াল থেকে বেরিয়ে ‘নন্দিনী’র মতো মুক্ত পৃথিবীর আহ্বান শুনবেন, নাকি ‘গডো’র অপেক্ষায় প্রহর গুনতে গুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়বে মানবতা? উত্তর মিলবে এই ঐতিহাসিক শান্তি সংলাপে।