Sabina Ahmed (সাবিনা আহমেদ)
৮ এপ্রিল আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে ২ সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এটাকে বলা হচ্ছে ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড। এতে ইরানের ১০-পয়েন্ট প্রস্তাবকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধবিরতি খুবই নড়বড়ে হয়ে গেছে। দুটো মূল বিরোধ দেখা দিয়েছে: ১) লেবানন যুদ্ধবিরতির আওতায় আছে কি না? এবং ২) হরমুজ প্রণালী কীভাবে খুলবে?
১. লেবানন ইস্যু নিয়ে যুদ্ধ বিরতিতেই সবচেয়ে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। এই বিষয়ে পাকিস্তান এবং ইরানের অবস্থান সম্পর্কে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ স্পষ্ট বলেছেন করে বলেছেন যে যুদ্ধবিরতি “সব জায়গায়, লেবাননসহ”। ইরানও একই কথা বলছে।
কিন্তু আমেরিকা আর ইজরায়েলের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। গতকাল ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন “এটা একটা legitimate misunderstanding। ইরানিরা ভেবেছিল লেবাননও আছে, কিন্তু আসলে ছিল না। আমরা কখনো এই প্রতিশ্রুতি দেইনি।” প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আজ তার পিবিএস এর সাক্ষাৎকারে লেবাননকে “separate skirmish” বলে উল্লেখ করেন। হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট বলেছে “লেবানন সিজফায়ারের অংশ নয়। এটা সব পক্ষকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।” আর নেতানিয়াহু জানিয়েছে “যুদ্ধবিরতি লেবাননে প্রযোজ্য নয়।”
আসলেও আমেরিকা প্রথমে পাকিস্তানের মতের পক্ষেই ছিল, কিন্তু ইসরায়েল না মানায় পরে সুর পাল্টেছে। এটা “ইউজুয়াল” ইসরায়েল-পক্ষপাতিত্বের একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।
যুদ্ধ বিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েল লেবাননের উপর তারে অপারেশন ইটার্নাল ডার্কনেস চালায়। ইসরায়েলের ৫০ টি ফাইটার-জেট মিনিটে ১০০+ টার্গেটে ১৬০+ বোমা ফেলেবৈরুতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা, দক্ষিণ লেবানন, বেকা ভ্যালিতে। এতে কমপক্ষে ১৮২-২৫৪ জন নিহত হয়। যা একদিনে সবচেয়ে বেশি নিহতদের সখ্য এই পর্যন্ত।
ইরান এটাকে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ বলে প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে হরমুজ প্রণালী আবার পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। এখানে তারা সম্ভাব্য মাইন পেতেছে বলে রিপোর্ট আছে। একই সাথে তারা গাল্ফে হামলা চালায়। কেবল ইউএই এর উপর ১৭টি ব্যালিস্টিক মিসাইল + ৩৫টি ড্রোন হামলা চালায়। হাবশান গ্যাস কমপ্লেক্সে ধ্বংসাবশেষ পড়ে ২ জন ইমিরাতি ও ১ জন ভারতীয় আহত।
ইরান কুয়েত, বাহরাইন, সৌদি আরব, কাতার এর উপরও মিসাইল-ড্রোন আক্রমণ চালায়। সবাই এয়ার ডিফেন্স চালু করে প্রতিহত করেছে। ইরানের যুক্তি হলো “ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভেঙেছে, তাই আমরাও এই বিরতি মানব না।”
একমাত্র ভালো খবর হচ্ছে সরাসরি আমেরিকা-ইরানের মধ্যে বড় আক্রমণ গত ২৪ ঘন্টায় বন্ধ আছে । ইরান এবং ইসরায়েল সরাসরি একে অপরকে হামলা করেনি।
২) হরমুজ প্রণালী কিভাবে খুলবে তা নিয়ে অলরেডি ইরান আর আমেরিকার মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
আমেরিকা চেয়েছিল কোনও প্রকার ইরানি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ ওপেন হবে। ঠিক যুদ্ধের আগে যেমন ছিলো তেমন অবস্থানে ফিরে যাবে এই প্রণালী।
কিন্তু ইরান যুদ্ধবিরতির রাজি হয়েছে এই শর্তে যে, হরমুজ তাদের IRGC এর তত্ত্বাবধানে খুলবে। অর্থাৎ ইরান জাহাজ পরিদর্শন, রুট নিয়ন্ত্রণ এবং কিছু ক্ষেত্রে “টোল/ফি” চাপানোর অধিকার রাখবে; সাথে যৌথভাবে থাকবে ওমান।
যুদ্ধবিরতির পর ইরান-নিয়ন্ত্রিত রুট দিয়ে মাত্র ২টি জাহাজ পার হয়েছে। এখন ইসরায়েলের লেবানন হামলার প্রতিক্রিয়ায় আবার এই প্রণালী বন্ধ। আমেরিকা এখন জোর দাবি করছে — পুরোপুরি এই রুট খুলে দাও।
আগামীকাল ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হবে। আমেরিকার পক্ষে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স নেতৃত্ব দেবেন, যাতে অন্যান্য উচ্চপদস্থ আমেরিকানরাও থাকবেন। ইরানের পক্ষে তাদের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ-এর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের ডেলিগেশন থাকবে। তবে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আসছেন না।
এই যুদ্ধবিরতি যদি টিকাতে চায়, তাহলে কাউকে না কাউকে বড় আপস করতেই হবে। লেবানন নিয়ে দুই গ্রুপের অবস্থান পুরোপুরি উল্টো। যদি ইরান মেনে নেয় তাহলে হিজবুল্লাহ দুর্বল হবে, কিন্তু ইরান নিজে টিকে যাবে এবং পরে শক্তি সঞ্চয় করবে। যদি ইসরায়েল মেনে নেয় তবে মধ্যপ্রাচ্যে আপাত শান্তি আসবে। যদিও ইরান একটা টাফ চ্যালেঞ্জার, যে লেবানন ও হরমুজ নিয়ে নিজেদের পজিশন আপস করবে বলে মনে হয়না।
ইসরায়েলের লক্ষ্য হচ্ছে ইরানকে দুর্বল করে “ফেইল্ড স্টেট” বানানো, তারপর গাজা-হিজবুল্লাহ স্টাইলে “মো দ্যা লন” নীতি অনুসরণ করা। কিন্তু আমেরিকা যদি ইজরায়েলের মাথার উপর থেকে ছাতা সরিয়ে দেয়, তাহলে ইসরায়েল একা কতদিন চালাতে পারবে — এ নিয়ে বড় সন্দেহ আছে।
আগামীকাল ইসলামাবাদে যে আলোচনা শুরু হবে, সেখানে এই লেবানন আর হরমুজ ইস্যু নিয়ে বড় ঝগড়া হবে। ইরান অলরেডি বলছে — লেবাননে হামলা বন্ধ না হলে তারা আলোচনায় বসবে না বা যুদ্ধবিরতি থেকে সরে যাবে।
আগামীকালের আলোচনার শুরুর দিকে তাকিয়ে আছে সারা বিশ্ব।