ইরানকে অশালীন ভাষায় হুমকি দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মানসিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনীতিবিদ। ট্রাম্প ওই পোস্টে ইরানকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘ওই অভিশপ্ত প্রণালি (হরমুজ) খুলে দাও, তোমরা পাগল বাস্টার্ডস’ এবং দেশটির জ্বালানি ও পরিবহন অবকাঠামোয় আরও হামলার হুমকি দেন। ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘মঙ্গলবার হবে পাওয়ার প্ল্যান্ট ডে, আর ব্রিজ ডে- সব একসাথে, ইরানে। এর মতো কিছু আর হবে না!!! ওই ফাকইন প্রণালি খুলে দাও, তোমরা পাগল বাস্টার্ডস, না হলে নরকে বাস করবে- দেখে নিও! আল্লাহ মহান। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড জে. ট্রাম্প।’
ট্রাম্প প্রশাসন ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়ার জন্য আরেকটি নিজস্ব নির্ধারিত সময়সীমা মঙ্গলবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বেঁধে দিয়েছে। সেই সময় ক্রমশ ঘনিয়ে আসছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস পরিবহন পথ এই প্রণালি ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ট্রাম্প বারবার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে তেহরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন এবং ইউরোপ ও ন্যাটো মিত্রদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধকে বৈধ বলে স্বীকার করেনি এবং হরমুজ সংকটে হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করেছে। ফলে ট্রাম্প ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়ার হুমকিও দিয়েছেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের যোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টা মেহদি তাবাতাবাই রবিবার বলেন, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ ‘নতুন আইনি কাঠামোর’ মাধ্যমে পরিশোধ না করা পর্যন্ত ইরান প্রণালি খুলবে না। তিনি আরও বলেন, অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়ে ট্রাম্প ‘চরম হতাশা ও রাগ থেকে অশালীনতা ও অর্থহীন কথাবার্তায় নেমে গেছেন।’
মার্কিন রাজনীতিবিদদের প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্পের একসময়ের ঘনিষ্ঠ মিত্র, পরে সমালোচক হওয়া মার্জোরি টেইলর গ্রিন বলেন, প্রশাসনের যারা নিজেদের খ্রিস্টান বলে দাবি করেন, তাদের উচিত ‘ঈশ্বরের কাছে ক্ষমা চাওয়া’ এবং প্রেসিডেন্টের ‘উন্মাদনা’ থামানো। এক্সে দীর্ঘ পোস্টে সাবেক রিপাবলিকান কংগ্রেসওম্যান টেইলর লিখেছেন, ‘আমি তোমাদের সবাইকে চিনি এবং তাকেও চিনি- সে পাগল হয়ে গেছে, আর তোমরা সবাই এতে সহযোগী। আমি ইরানকে সমর্থন করছি না, কিন্তু সত্যটা বলা দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রণালি বন্ধ হয়েছে কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কোনো উসকানি ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে, একই পুরানো পারমাণবিক মিথ্যার ভিত্তিতে। পারমাণবিক অস্ত্র কার আছে জানো? ইসরাইলের। তারা নিজেরাই নিজেদের রক্ষা করতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের যুদ্ধ লড়তে হবে না, নিরীহ মানুষ ও শিশুদের হত্যা করতে হবে না। ট্রাম্প বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুতে হামলার হুমকি দিয়ে ইরানি জনগণকেই আঘাত করছেন, যাদের তিনি মুক্ত করার দাবি করেছিলেন।’
উল্লেখ্য, গত বছর থেকেই ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন টেইলর গ্রিন। বিশেষ করে তিনি ইরানে হামলার সমালোচনা করে বলেন, এটি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির বিরুদ্ধ। তিনি লিখেছেন, ‘২০২৪ সালে আমেরিকান জনগণ যা চেয়েছিল, এটি তা নয়। এটি আমেরিকাকে মহান করছে না- এটি মন্দ।’
ট্রাম্পের আচরণকে সিনেটের সংখ্যালঘু নেতা চাক শুমার ‘একজন উন্মত্ত পাগলের মতো’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি এক্সে লিখেছেন, ‘শুভ ইস্টার, আমেরিকা। যখন আপনারা চার্চে যাচ্ছেন, পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় একজন উন্মত্ত পাগলের মতো আচরণ করছেন। তিনি সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের হুমকি দিচ্ছেন এবং মিত্রদের দূরে ঠেলে দিচ্ছেন। এটা তার চরিত্র হতে পারে, কিন্তু এটা আমাদের নয়। আমাদের দেশ এর চেয়ে অনেক ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য।’
স্বতন্ত্র সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স এটিকে ‘বিপজ্জনক এবং মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি লিখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাস পর, ইস্টার সানডেতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্য- এটি একজন বিপজ্জনক ও মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন ব্যক্তির উন্মত্ত প্রলাপ। কংগ্রেসকে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। এই যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে।’
সিনেটর ক্রিস মারফিও এটিকে ‘পুরোপুরি উন্মত্ত’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি যদি ট্রাম্পের মন্ত্রিসভায় থাকতাম, তাহলে ২৫তম সংশোধনী নিয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলতাম। এটি সম্পূর্ণ উন্মত্ত আচরণ। তিনি ইতিমধ্যেই হাজার হাজার মানুষ হত্যা করেছেন, আরও হাজার হাজার মানুষ মারা যাবে।’
২৫তম সংশোধনী প্রয়োগ করলে প্রেসিডেন্টকে অযোগ্য ঘোষণা করে ভাইস প্রেসিডেন্টকে দায়িত্ব দেয়া যায়। তবে বাস্তবে এটি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ডেমোক্রেট প্রতিনিধি রো খান্না বলেন, ট্রাম্প যখন ‘গালি দিচ্ছেন এবং যুদ্ধাপরাধের হুমকি দিচ্ছেন’, তখন ইরানে থাকা মার্কিন সেনাদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তিনি এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’-এ বলেন, ‘এই যুদ্ধ এখনই শেষ করতে হবে। অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি দরকার। ইরান, ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে বোমাবর্ষণ বন্ধ করে আলোচনায় বসতে হবে।’
ট্রাম্পকে সিনেটর টিম কেইন ‘বক্তব্য কমানোর’ আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ট্রাম্পের ভাষা ‘লজ্জাজনক ও অপরিণত’ এবং এতে মার্কিন সেনাদের ঝুঁকি বাড়ছে।