জেরুজালেমের পুরোনো শহরের খ্রিস্টান কোয়ার্টার; যেখানে সাধারণত পবিত্র সপ্তাহে ভিড়, প্রার্থনা আর শোভাযাত্রায় মুখর থাকে। সেখানে এখন অস্বাভাবিক নীরবতা। ফাঁকা রাস্তা, বন্ধ দোকান, নেই তীর্থযাত্রীদের আনাগোনা। ‘হোলি উইক’ উপলক্ষে যখন বিশ্বজুড়ে খ্রিস্টানরা যিশুখ্রিস্টের গ্রেপ্তার, ক্রুশবিদ্ধ হওয়া এবং পুনরুত্থানের স্মরণে প্রার্থনায় মগ্ন, তখন জেরুজালেমে বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন।
পুরোনো শহরের এক ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান ব্যবসায়ী, ছদ্মনাম ‘বুলুস’, সপ্তাহে দুয়েকদিন দোকান খুলছেন ঠিকই, তবে আধখোলা শাটারের আড়ালে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের নির্দেশে দোকান বন্ধ রাখার চাপ এড়িয়ে এভাবেই চলছে তার ব্যবসা। চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
গত ছয় বছর ধরে মহামারি থেকে শুরু করে ধারাবাহিক সংঘাতে বুলুসের ব্যবসা প্রায় ভেঙে পড়েছে।
হতাশ কণ্ঠে বুলুস বলেন, এর আগে অবস্থা খারাপ ছিল, তবে অন্তত নিজের খাওয়ার মতো আয় হতো। এখন একেবারেই কিছু নেই।
দুপুর পর্যন্ত তার দোকানে কোনো ক্রেতা ছিল না। পরে এক ইথিওপীয় খ্রিস্টান নারী এসে এক কেজি মোমবাতি কিনলেন প্রার্থনার জন্য। দিনভর আয় দাঁড়াল মাত্র ৩৫ শেকেল (প্রায় ১১ ডলার)। এতে কি আর হয়? প্রশ্ন করেন বুলুস।
পশ্চিম জেরুজালেমে আশ্রয়কেন্দ্র কাছাকাছি থাকায় কিছু দোকান খোলা রাখা গেছে।
জেরুজালেমে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা ব্রাদার দাউদ কাসাব্রি বলেন, জীবনে এই প্রথম জেরুজালেমকে এতটা বিষণ্ন দেখছি।
দাউদের স্কুলে এক মাসের বেশি সময় ধরে সরাসরি ক্লাস বন্ধ। তিনি মন্তব্য করেন, এটা আমাদের সবার জন্যই সবচেয়ে কঠিন সময়।
পবিত্র সপ্তাহে যিশুর জেরুজালেমে আগমন, শেষ নৈশভোজ, ক্রুশবিদ্ধ হওয়া এবং পুনরুত্থানের ঘটনাগুলো স্মরণ করা হয়। এটি খ্রিস্টানদের কাছে ত্যাগ, ক্ষমা, ভালোবাসা এবং নতুন আশার প্রতীক। প্রতিবছর পাম সানডে উপলক্ষে শিক্ষার্থীরা স্কাউটদের সঙ্গে শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। কিন্তু এবার তা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, জেরুজালেমের ল্যাটিন প্যাট্রিয়ার্ক পিয়েরবাত্তিস্তা পিৎসাবাল্লাকেও চার্চ অব দ্য হোলি সেপালখারে প্রবেশ করে প্রার্থনা পরিচালনা করতে বাধা দেওয়া হয়;। স্থানটি খ্রিস্টানদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত।
কার্ডিনাল পিজাবাল্লা বলেন, অনেক কিছু বাতিল করা যায়, কিন্তু ইস্টারের উপাসনা কেউ বাতিল করতে পারে না; পোপও না। ‘শতাব্দীর মধ্যে এই প্রথম’ এমন ঘটনা ঘটল।
আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়ে অবশ্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে এই পদক্ষেপের ব্যাখ্যা দেন। যদিও পরে সীমিত পরিসরে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখা হয়।
এই ঘটনাকে ঘিরে জেরুজালেমের পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রচলিত ব্যবস্থায় খ্রিস্টান ও মুসলিম ধর্মীয় স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ থাকে সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের হাতে এবং জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ দ্বিতীয় (জর্ডানের রাজা) তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখেন।
স্থানীয় খ্রিস্টানদের অভিযোগ, ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে তারা ক্রমশ বৈরী পরিবেশের মুখে পড়ছেন। বিশপ এমেরিটাস মুনিব ইউনান জানান, পুরোনো শহরে ইহুদি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বহুবার অপমানের শিকার হয়েছেন তিনি, কিন্তু কোনো বিচার হয়নি।
বুলুস বলেন, এখন তিনি জেরুজালেমে না গিয়ে বেথলেহেমের চার্চ অব দ্য ন্যাটিভিটিতে প্রার্থনা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কারণ, ওখানে অন্তত বন্দুক তাক করে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে না। তার অভিযোগ, তারা পুরো বিশ্বকে দেখাতে চান এই দেশ শুধু তাদের জন্য, খ্রিস্টান বা মুসলমানদের জন্য নয়।
খ্রিস্টানদের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করার ঘোষণা এলেও মুসলিমদের ক্ষেত্রে চিত্র ভিন্ন। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। রমজান ও ঈদের সময়ও অনেককে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। ঈদের দিন পুরোনো শহরের বাইরে নামাজ আদায়ের চেষ্টা করলে ইসরায়েলি বাহিনী টিয়ার গ্যাস, স্টান গ্রেনেড ও লাঠিচার্জ করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় মুসল্লিদের।
জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের সংখ্যা এখন ২ শতাংশেরও কম। পবিত্র সপ্তাহের শোভাযাত্রা ও ধর্মীয় আচার বাতিল হওয়ায় এই ছোট সম্প্রদায়ের ঐক্য আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে। ব্রাদার কাসাব্রি জানান, অনেকেই সারা বছর গির্জায় না এলেও এই সময়টাতে আসেন। এটা জেরুজালেমের উৎসব।
অর্থনৈতিক সংকটও বাড়ছে। পর্যটন খাত বন্ধ থাকায় তরুণদের মধ্যে দেশ ছাড়ার প্রবণতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার জন্য সাহায্য চাইছেন অনেকে। জেরুজালেমের বিশপ ইউনান বলেন, এ সমস্ত ঘটনায় আমরা ইসরায়েলিদের দোষ দিই না। কিন্তু এটা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য খারাপ।
বুলুস নিজেও দেশ ছাড়ার কথা ভেবেছেন। তবুও সপ্তাহে কয়েকদিন দোকানে আসেন। কিন্তু পরিস্থিতি এমন, প্রতিদিন ক্রেতাহীন অবস্থায় থাকতে হয় তার। তিনি বলেন, আমি এখানে আসি নিজেকে বোঝাতে যে এখনও আমার মধ্যে আশা আছে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। এই পরিস্থিতির শেষ হয় না। একটা সময় মানুষ হাল ছেড়ে দেয়।
এই হতাশার মধ্যেও স্থানীয় ধর্মযাজকরা মানুষকে স্থির থাকার আহ্বান জানাচ্ছেন। আইন আরিক এলাকার ঘোষণাপর্বে ল্যাটিন প্যারিশের ফাদার ফারিস আবেদরাব্বো বলেছেন, ধৈর্য মানে নিঃক্রিয় থাকা নয়, এটা এক ধরনের আত্মিক প্রতিরোধ; সত্যে অটল থাকা, ঘৃণাকে প্রত্যাখ্যান করা, এবং জীবনকে বেছে নেওয়া।