আমেরিকা অবশেষে ইরানে ভূপাতিত এফ-১৫ ঈগলের ওয়েপনস স্পেশালিস্ট অফিসারকে (পাইলট) উদ্ধার করতে পেরেছে। প্রথমবারের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়বার সফল অভিযান চালিয়ে ওই পাইলটকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে।
আমেরিকার এই কমব্যাট সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ অভিযানে টেকনোলজি, টেরেইন আর কিছু স্মার্ট ট্যাকটিক্স তাদের পক্ষে ছিল, তাই এই উদ্ধার কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে। যদিও আমেরিকার পক্ষ বলেছে এটা তাদের জীবনের কঠিনতম উদ্ধারকাজ ছিল।
আমেরিকার পাইলটরা শত্রু অঞ্চলে ইজেকশন (বিমান থেকে জরুরি বহির্গমন) করার জন্য প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। বিশষে করে যুদ্ধকালীন দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকার মতো চ্যালেঞ্জিং পদক্ষেপ নিতে হতে পারে পাইলটদের। যেমনটি আজ উদ্ধারকৃত পাইলটের অবস্থায় দেখা গেছে।
একটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে ইরান। বিমানে থাকা দুইজন ক্রু সদস্য ইরানের অভ্যন্তরে ইজেক্ট করতে সক্ষম হন। মার্কিন সামরিক বাহিনী পরবর্তীতে তাদের একজনকে খুঁজে বের করেছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, মার্কিন পাইলটদের বিমান দুর্ঘটনাকালীন পরিস্থিতির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যেখানে তারা ইজেক্ট করতে, অবতরণ করতে এবং উদ্ধারের অপেক্ষায় লুকিয়ে থাকার জায়গা খুঁজে নিতে বাধ্য হন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শত্রু অঞ্চলে সামরিক বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পরিস্থিতির প্রস্তুতি ‘এসইআরই’ (সারভাইভাল, ইভেশন, রেজিস্ট্যান্স এবং এসকেপ) প্রশিক্ষণ নামে পরিচিত।
ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) প্রাক্তন প্রধান অ্যাডমিরাল উইলিয়াম ফ্যালন বলেন, প্রথম ধাপ হলো নিরাপদে ইজেক্ট করা। মাটিতে নামার পর, শত্রুর কাছে ধরা পড়া এড়াতে পাইলটদের অবশ্যই একটি নিরাপদ জায়গা খুঁজে নিতে হবে। তাদের কাছে থাকা যোগাযোগ যন্ত্র ব্যবহার করে মার্কিন বাহিনীকে নিজেদের অবস্থান জানানোর কথা রয়েছে, যাতে উদ্ধারকারী দল তাদের খুঁজে পেতে পারে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরান-সংলগ্ন ইরাক ও সিরিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে বিশেষ অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দল মোতায়েন রেখেছে।
প্রথম পাইলটকে খুঁজে পাওয়ার খবর আসার আগে ফ্যালন বলেছিলেন, ধরে নিচ্ছি তারা ইজেক্ট করেছেন, তারা হয়তো মাটিতে কোথাও বেঁচে আছেন। আমার মতে, মূল বিষয় হলো দিনের সময়। এখন সূর্যাস্তের কাছাকাছি সময়, যা আমাদের জন্য অনুকূল। কারণ, আমাদের অনুসন্ধান ও উদ্ধারকারী দলগুলো সাধারণত রাতে অঅভিযান পরিচালনা করে থাকে।
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বিবৃতির বরাতে দুটি ইরানি সংবাদ মাধ্যম ফার্স এবং তাসনিম আগে জানিয়েছিল, হেলিকপ্টারগুলো মার্কিন পাইলটদের খুঁজছে। ফার্রস জানিয়েছে, হেলিকপ্টারগুলো কোথা থেকে এসেছে তা স্পষ্ট নয়, অন্যদিকে তাসনিম দাবি করেছে, সেগুলো আমেরিকান হেলিকপ্টার এবং একটি হেলিকপ্টার গুলিবর্ষণের মুখে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইলটদের জিম্মি হওয়ার পরিস্থিতির জন্যও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যার মধ্যে রয়েছে চরম মানসিক চাপ, জিজ্ঞাসাবাদ এবং বন্দি অবস্থায় সম্ভাব্য নির্যাতনের মোকাবিলা করা।
ফ্যালন বলেন, ইজেক্ট করার পর পাইলটদের উচিত কোনো অন্ধকার এলাকায় পৌঁছানো এবং ঘন বন বা জনবসতি থেকে দূরে এমন স্থানে লুকিয়ে থাকা, যা সহজে শনাক্ত করা যায় না। ইরানের বিশাল জনমানবহীন এলাকা রয়েছে যা লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিকে থাকা বিশেষভাবে কঠিন হতে পারে। ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্থলবাহিনী নেই এবং ইজেক্ট করা ক্রু সদস্য আহত হতে পারেন। পানি ও খাবারের অভাব এবং প্রতিকূল আবহাওয়ায় বেঁচে থাকার লড়াইকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
শুক্রবার সকালেই ইরানি কর্মকর্তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের মার্কিন পাইলটদের খোঁজার আহ্বান জানান। কোহগিলুয়েহ ও বোয়ার-আহমদ প্রদেশের একটি স্থানীয় চ্যানেল দাবি করেছে, যে কেউ তাদের ধরতে পারলে নগদ অর্থ পুরস্কার দেওয়া হবে।
রোববার (৫ এপ্রিল) টানা দুই দিন ধরে চলা নাটকীয়তার অবসান ঘটেছে। দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার পর অবশেষে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার করা হয়েছে দ্বিতীয় পাইলটকে।
সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, বিশেষ অভিযানে দক্ষ মার্কিন স্পেশাল অপারেশন ফোর্সেস এই অভিযান পরিচালনা করেছে। পুরো উদ্ধার অভিযানটি অন্ধকারের মধ্যে শুরু হলেও এর সমাপ্তি ঘটে ভোরের আলোয়। সেখানে একটি ভয়াবহ গোলাগুলি হয়েছে বলে জানা গেছে। মার্কিন প্রশাসন ওই বিমান সেনার অবস্থান সম্পর্কে যা জানত, ইরানি কর্তৃপক্ষও তা আগে থেকেই টের পেয়ে গিয়েছিল।