এপ্রিল মাসের প্রথম দিনটি বিশ্বব্যাপী ‘এপ্রিল ফুলস ডে’ বা ‘বোকা বানানোর দিন’ হিসেবে পালিত হলেও এর উৎস নিয়ে রয়েছে নানা মতভেদ ও বিতর্ক। বাংলাদেশসহ মুসলিম বিশ্বের অনেক জায়গায় একটি প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে, ১৪৯২ সালে স্পেনের গ্রানাডায় মুসলমানদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া এক ট্র্যাজেডি থেকেই এই দিবসের শুরু।
বলা হয়, তৎকালীন স্প্যানিশ শাসকরা মুসলমানদের একটি মসজিদে নিরাপদ আশ্রয়ের কথা বলে সেখানে আটকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল এবং দিনটি ছিল ১ এপ্রিল।
তবে ঐতিহাসিক তথ্য ও দীর্ঘদিনের গবেষণায় এই দাবির কোনো সুনির্দিষ্ট ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়নি। আধুনিক ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মতে, গ্রানাডার পতন হয়েছিল ১৪৯২ সালের জানুয়ারি মাসে এবং মসজিদে পুড়িয়ে মারার এই তথ্যটি একটি ভুল বিশ্বাস বা গুজব হিসেবেই পরিচিত।
এপ্রিল ফুলস ডের প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য তত্ত্বটি পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। ১৫৬৪ সালে ফ্রান্সের সম্রাট নবম চার্লস ঘোষণা করেন, নতুন বছর এপ্রিলের পরিবর্তে ১ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে। সেই যুগে সংবাদ আদান-প্রদানের ধীরগতির কারণে অনেকেই এই পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে পারেননি অথবা পুরনো প্রথা অনুযায়ী ১ এপ্রিলই নববর্ষ উদযাপন করতে থাকেন।
যারা নতুন ক্যালেন্ডার মেনে ১ জানুয়ারি নববর্ষ পালন শুরু করেছিলেন, তারা পুরোনোপন্থীদের ‘এপ্রিলের বোকা’ বলে উপহাস করতে শুরু করেন। ফ্রান্সে এই দিনটি ‘এপ্রিল ফিশ’ নামেও পরিচিত, যেখানে মজার ছলে একজনের অজান্তে তার পিঠে কাগজের মাছ আটকে দেওয়া হয়।
ইংরেজ সাহিত্যের ইতিহাসেও এই দিবসের সূত্র পাওয়া যায়। কবি জিওফ্রে চসারের ‘দ্য নানস প্রিস্টস টেল’ কবিতায় একটি মোরগ ও শিয়ালের একে অপরকে বোকা বানানোর গল্প রয়েছে। সেখানে উল্লিখিত একটি তারিখকে অনেক পণ্ডিত ১ এপ্রিল হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
এ ছাড়া প্রাচীন রোমের ‘হিলারিয়া’ উৎসবের সঙ্গেও এর সাদৃশ্য খুঁজে পান ইতিহাসবিদরা। হিলারিয়া ছিল আনন্দ ও ছদ্মবেশ ধারণের একটি উৎসব, যেখানে সামাজিক মর্যাদার পার্থক্য ভুলে সবাই একে অপরকে কৌতুকের মাধ্যমে আনন্দ দিত। আবার বসন্তের শুরুতে আবহাওয়ার অনিশ্চিত পরিবর্তনের কারণেও অনেকে একে প্রকৃতির ‘বোকা বানানোর’ সঙ্গে তুলনা করেন।
ইতিহাসে এই দিনটিকে ঘিরে অনেক বড় বড় প্র্যাঙ্ক বা রসিকতার নজির রয়েছে। ১৬৯৮ সালে লন্ডনে ‘সিংহের গোসল’ দেখানোর মিথ্যা আমন্ত্রণ জানিয়ে হাজারো মানুষকে বোকা বানানো হয়েছিল।
আবার ১৯৫৭ সালে বিবিসি একটি প্রতিবেদনে দেখিয়েছিল, সুইজারল্যান্ডে গাছে স্প্যাগেটি বা নুডলস ফলছে, যা টেলিভিশনের ইতিহাসে অন্যতম বড় এপ্রিল ফুল প্র্যাঙ্ক হিসেবে স্বীকৃত। যদিও বর্তমান যুগে ভুয়া খবরের ভিড়ে ‘এপ্রিল ফুলস ডে’ পালনে বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন পড়ে, তবে ঐতিহাসিকভাবে এটি কোনো ধর্মীয় ট্র্যাজেডি নয় বরং দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা এক বৈশ্বিক লোকপ্রথা ও হাস্যরসের বহিঃপ্রকাশ।