মাসুম খলিলী
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে আরব ও অন্য প্রতিবেশি মুসলিম দেশগুলোকে টেনে আনার জন্য নানা চেষ্টা ও কৌশল নিয়েছে। কিন্তু এখনো পরযন্ত এক্ষেত্রে কোন সাফল্য আসেনি। কেন এই ব্যর্থতা তা নিয়ে ইসরাইলী বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি নিয়ে ইসরাইলী বিশ্লেষক উদি ডেকেল (Udi Dekel) আইএসএসএন –এ বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। সামরিক সাফল্য থেকে একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থায় (From Military Achievement to a Regional Arrangement) শীর্ষক এই লেখায় মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা তুলে ধরা হয়েছে যে—সামরিক সাফল্য কখনোই নিজে নিজে স্থায়ী কৌশলগত বিজয়ে পরিণত হয় না, যদি তা রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক ব্যবস্থায় রূপ না পায়।
এই দৃষ্টিভঙ্গির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, বিশেষ করে ইসরাইল-এর সামরিক অভিযান। সামরিকভাবে কোনো লক্ষ্য অর্জন—যেমন প্রতিপক্ষের অবকাঠামো ধ্বংস, নেতৃত্ব দুর্বল করা বা সীমান্তে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা—তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু ডেকেলের মতে, এই সাফল্য টেকসই করতে হলে তা একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে স্থানান্তর করতে হবে।
উদি ডেকেল-এর তত্ত্ব অনুযায়ী সামরিক অর্জনকে আঞ্চলিক ব্যবস্থায় রূপান্তরের প্রশ্নটি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বাস্তবে তার সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে—মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত দ্বিধা। বিশেষ করে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্র জোট এখনো পর্যন্ত আরব ও অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোকে সরাসরি ইরান-বিরোধী যুদ্ধে টানতে পারছে না।
এর পেছনে কয়েকটি গভীর কাঠামোগত কারণ রয়েছে।
প্রথমত, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বনাম আদর্শিক অবস্থান। অনেক আরব রাষ্ট্র ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে চায় না। কারণ যুদ্ধ মানে শুধু সামরিক ঝুঁকি নয়—অর্থনৈতিক বিপর্যয়, জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট। বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের অর্থনৈতিক রূপান্তর (ভিসন ধরনের প্রকল্প) ঝুঁকিতে ফেলতে চায় না।
দ্বিতীয়ত, জনমত ও ফিলিস্তিন ইস্যু। আরব বিশ্বে সাধারণ জনগণের বড় অংশ এখনো ফিলিস্তিন প্রশ্নে সংবেদনশীল। ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি সামরিক জোট গঠন করলে তা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে। যদিও আব্রাহাম চুক্তি কিছু রাষ্ট্রকে ইসরাইলের কাছাকাছি এনেছে, কিন্তু তা নিরাপত্তা সহযোগিতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ—যুদ্ধ জোটে রূপ নেয়নি।
তৃতীয়ত, ইরানের প্রতিরোধ সক্ষমতা ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক। ইরান সরাসরি যুদ্ধের পাশাপাশি একটি বিস্তৃত প্রক্সি কাঠামো গড়ে তুলেছে—লেবানন, ইয়েমেন, ইরাক ও সিরিয়ায় তাদের প্রভাব রয়েছে। ফলে কোনো আরব রাষ্ট্র সরাসরি যুদ্ধে জড়ালে সংঘাত শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা বহু ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়বে। এই বহুমাত্রিক ঝুঁকি দেশগুলোকে সতর্ক রাখছে।
চতুর্থত, কৌশলগত ভারসাম্য নীতি (hedging strategy)। অনেক মুসলিম দেশ এখন একক জোটে নির্ভর না করে বহুমুখী সম্পর্ক বজায় রাখছে। তারা একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে। এই ভারসাম্য নীতি তাদেরকে বড় শক্তির সংঘাতে সরাসরি পক্ষ নেওয়া থেকে বিরত রাখে।
পঞ্চমত, যুদ্ধের অনিশ্চয়তা ও শাসনের টিকে নিয়ে উদ্বেগ। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শাসনব্যবস্থা অভ্যন্তরীণভাবে ভঙ্গুর। একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে জড়ালে তা শাসনব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। ফলে তারা সংঘাত এড়িয়ে কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ষষ্ঠত, সাম্প্রতিক পুনর্মিলন প্রবণতা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু আরব রাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছে (যেমন সৌদি-ইরান পুনর্মিলন উদ্যোগ)। এই প্রবণতা দেখায় যে, সংঘাতের পরিবর্তে ‘বৈরিতার ব্যবস্থাপনা’ এখন আরবদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য কৌশল।
এই বাস্তবতায়, ডেকেলের ধারণা—সামরিক অর্জনকে আঞ্চলিক ব্যবস্থায় রূপান্তর—বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু শক্তি প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক কূটনৈতিক কাঠামো প্রয়োজন, যেখানে আরব ও মুসলিম দেশগুলো নিজেদের স্বার্থ নিরাপদ মনে করবে।
ইসরাইল-আমেরিকা জোটের প্রধান সীমাবদ্ধতা এখানেই: তারা সামরিকভাবে শক্তিশালী হলেও, একটি গ্রহণযোগ্য আঞ্চলিক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে এখনো সফল হয়নি। আর এই শূন্যতাই ইরানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার বদলে একটি প্রভাবশালী আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবে টিকে থাকার সুযোগ দিচ্ছে।
আর একই কারণে ইসরাইল সামরিক সাফল্য কম বেশি যা পেয়েছে সেই অর্জনকে কূটনৈতিক লাভে রূপান্তরিত করতে পারেনি। বিশ্বের একটি বড় জনগোষ্ঠির কাছে ইসরাইল নির্মমতা ও ধ্বংসের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কেন এটি হলো তার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে।
প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা হলো এখানে শক্তির ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে—বিশেষ করে ইরান-এর প্রভাব, অ-রাষ্ট্রীয় গোষ্ঠীগুলোর উত্থান, এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত পুনর্বিন্যাস। এই বাস্তবতায়, একক সামরিক পদক্ষেপের চেয়ে বহুপাক্ষিক নিরাপত্তা কাঠামো বেশি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু সেটি ইসরাইল বা যুক্তরাষ্ট্র পারেনি।
দ্বিতীয়ত, ইসরাইল সামরিক সাফল্যকে “রাজনৈতিক ক্যাপিটাল” হিসেবে ব্যবহার করতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো অভিযান প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে, তাহলে সেই মুহূর্তে কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে স্থায়ী সমাধানের পথে এগোনো সম্ভব। অন্যথায়, সংঘাত পুনরায় জ্বলে উঠার ঝুঁকি থেকেই যায়—যা আমরা অতীতে বহুবার দেখা গেছে। ইরান এবার সাময়িক যুদ্ধ বিরতির ফাঁদে পা দেয়নি।
তৃতীয়ত, আঞ্চলিক জোট গঠন ইসরাইলের এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু আরব রাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে সাফল্য একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। এই ধরনের উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারণ করে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করার চেষ্টা গাজা যুদ্ধের কারণে সম্ভব হয়নি। অধিকন্তু ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভুতি ইরানের পক্ষে চলে গেছে।
আব্রাহাম চুক্তি কৌশল ব্যর্থ হবার কারণের মধ্যে রয়েছে- প্রথমত, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত—যা যেকোনো আঞ্চলিক ব্যবস্থার জন্য একটি বড় বাধা। দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ—দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমঝোতাকে কঠিন করে তোলে। তৃতীয়ত, বহিরাগত শক্তি যেমন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া বা চীনের ভূমিকা এই সমীকরণকে আরও জটিল করে তোলে।
এই প্রেক্ষাপটে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা শুধু সংঘাতের নয়—বরং একটি নতুন আঞ্চলিক ব্যবস্থার সম্ভাব্য সূচনাও নির্দেশ করে। প্রশ্ন হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো কি সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারবে , নাকি প্রতিরোধের সামরিক সাফল্য আবারও একটি অসম্পূর্ণ কাহিনিতে পরিণত হবে।